ডেক্স রিপোর্ট : | সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট | ২১৪ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন শিক্ষার সাফল্য প্রায়শই একটি জিপিএ, একটি সার্টিফিকেট কিংবা একটি চাকরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যালয়ে পাঠদান ক্রমেই নির্ধারিত সিলেবাস শেষ করা, পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্ন অনুশীলন করানো এবং সর্বোচ্চ নম্বর অর্জনের প্রতিযোগিতায় আবদ্ধ হচ্ছে। ফলে শিক্ষা যেন একটি যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে, যেখানে জ্ঞানার্জনের আনন্দ, মানবিক মূল্যবোধ এবং চরিত্র গঠনের বিষয়গুলো ক্রমশ আড়ালে চলে যাচ্ছে।
কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা কখনোই কেবল তথ্য মুখস্থ করার নাম নয়। প্রকৃত শিক্ষা হলো মানুষের চিন্তাশক্তিকে জাগ্রত করা, নৈতিকতা গড়ে তোলা, সহমর্মিতা শেখানো এবং একজন মানুষকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। আর এই কাজটি কোনো যান্ত্রিক নিয়ম বা গদবাঁধা পদ্ধতির মাধ্যমে সম্ভব নয়। এটি নির্ভর করে শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব, আন্তরিকতা এবং শিক্ষার্থীকে ঘিরে তাঁর মানবিক সম্পর্কের ওপর।
একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই পড়ান না, তিনি নিজের জীবন দিয়েও শিক্ষা দেন। শিক্ষার্থীরা অনেক সময় শিক্ষকের কথার চেয়ে তাঁর আচরণকে বেশি অনুসরণ করে। শিক্ষক সময়নিষ্ঠ হলে শিক্ষার্থী সময়ের মূল্য শেখে। শিক্ষক সত্যবাদী হলে শিক্ষার্থী সততার গুরুত্ব উপলব্ধি করে। শিক্ষক বিনয়ী হলে শিক্ষার্থী শিখে কীভাবে অন্যকে সম্মান করতে হয়। আবার একজন শিক্ষক যদি দায়িত্বহীন, অসৎ বা রূঢ় আচরণ করেন, তবে সেটিও শিক্ষার্থীর মনে গভীর ছাপ ফেলে।
এ কারণেই শিক্ষকের ব্যক্তিত্বকে বলা হয় শিক্ষার ‘অলিখিত সিলেবাস’। এই সিলেবাস কোনো বইয়ে লেখা থাকে না, পরীক্ষার খাতায় নম্বরও পাওয়া যায় না, কিন্তু জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখান থেকেই আসে। অনেক মহান মানুষ তাঁদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার কৃতিত্ব কোনো একটি বইকে নয়, বরং একজন অনুপ্রেরণাদায়ী শিক্ষককে দিয়েছেন। কারণ একজন আদর্শ শিক্ষক কেবল জ্ঞান দেন না, তিনি শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস, নৈতিক সাহস এবং স্বপ্ন দেখার ক্ষমতাও জাগিয়ে তোলেন।
শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে ভালো শেখে তখনই, যখন তারা নিরাপদ, সম্মানিত এবং গ্রহণযোগ্য বোধ করে। ভয়ভীতি, অপমান কিংবা শাস্তির পরিবেশে সাময়িকভাবে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা গেলেও প্রকৃত শিক্ষা অর্জিত হয় না। বরং এমন পরিবেশ শিক্ষার্থীর কৌতূহল, প্রশ্ন করার সাহস এবং সৃজনশীল চিন্তাকে দমিয়ে দেয়।
একজন আন্তরিক শিক্ষক জানেন, একই শ্রেণিকক্ষের সব শিক্ষার্থীর মেধা, পারিবারিক পরিবেশ কিংবা শেখার গতি এক নয়। তাই দুর্বল শিক্ষার্থীকে তুচ্ছ না করে ধৈর্য নিয়ে পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত শিক্ষকের পরিচয়। একটি উৎসাহব্যঞ্জক বাক্য, একটি আন্তরিক হাসি কিংবা একটি সহানুভূতিশীল স্পর্শ অনেক সময় এমন আত্মবিশ্বাস তৈরি করে, যা কোনো পাঠ্যবই বা কোচিং সেন্টার দিতে পারে না।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীর এই আত্মিক সম্পর্কই শিক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। একজন শিক্ষার্থী যখন বিশ্বাস করে যে তাঁর শিক্ষক তাঁকে বুঝতে পারেন এবং তাঁর সাফল্য কামনা করেন, তখন শেখার প্রতি তার আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যায়। শিক্ষা তখন আর বাধ্যবাধকতা থাকে না, হয়ে ওঠে আনন্দময় আত্ম-আবিষ্কারের যাত্রা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আজ তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষাসামগ্রী তৈরিতে অসাধারণ দক্ষতা দেখাচ্ছে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তি শিক্ষার আরও অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তবুও এআই কখনো একজন প্রকৃত শিক্ষকের বিকল্প হতে পারবে না।
কারণ শিক্ষা কেবল তথ্য আদান-প্রদানের বিষয় নয়, এটি মানুষ গড়ার শিল্প। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর চোখের ভাষা বুঝতে পারেন, তার হতাশা অনুভব করতে পারেন, ব্যর্থতার মুহূর্তে সাহস জোগাতে পারেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের ভাষা, আচরণ ও পদ্ধতি পরিবর্তন করতে পারেন। একটি যন্ত্র সহানুভূতি অনুকরণ করতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের মমতা অনুভব করতে পারে না। এটি তথ্য দিতে পারে, কিন্তু অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে না। এটি উত্তর জানাতে পারে, কিন্তু চরিত্র নির্মাণ করতে পারে না।
প্রযুক্তি হবে শিক্ষকের সহায়ক, প্রতিস্থাপক নয়। কারণ মানুষ গড়ার জন্য মানুষের হৃদয়ই সবচেয়ে বড় শক্তি।
বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় সংকট হলো মুখস্থনির্ভরতা এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন। অনেক শিক্ষার্থী শেখে নম্বর পাওয়ার জন্য, জানার আনন্দে নয়। পরীক্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মুখস্থ করা তথ্যও ভুলে যায়। ফলে শিক্ষা স্থায়ী জ্ঞান কিংবা দক্ষতায় রূপান্তরিত হয় না।
এই প্রবণতা সৃজনশীলতাকে সীমাবদ্ধ করে। প্রশ্ন করার বদলে শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত উত্তর মুখস্থ করতে শেখে। নতুন কিছু ভাবার পরিবর্তে প্রচলিত উত্তর পুনরাবৃত্তি করে। ধীরে ধীরে বিশ্লেষণী চিন্তা, কল্পনাশক্তি এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অতিরিক্ত নম্বরকেন্দ্রিক মানসিকতা অনেক ক্ষেত্রে নৈতিক অবক্ষয়েরও জন্ম দেয়। যখন সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হয়ে ওঠে ফলাফল, তখন সততা, সহযোগিতা এবং মানবিক মূল্যবোধের চেয়ে প্রতিযোগিতা ও ব্যক্তিস্বার্থ বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করে। শিক্ষা তখন মানুষ গড়ার পরিবর্তে কেবল পরীক্ষার্থী তৈরির কারখানায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
শুনতেছি, সরকার বাহাদুর শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কার করবেন। আশা করবো এই শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার কেবল পাঠ্যক্রম পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিক্ষক সংস্কারেও অধিক, উপযুক্ত ও যৌক্তিক মনোযোগ দিতে হবে। মানসম্মত শিক্ষক তৈরির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষক নিয়োগে শুধু বিষয়জ্ঞান নয়, নৈতিকতা, নেতৃত্ব, যোগাযোগ দক্ষতা এবং মানবিক গুণাবলিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে প্রশ্ন করা, ভুল করা, নতুনভাবে ভাবা এবং পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শনকে উৎসাহিত করা হবে।
অভিভাবকদেরও বুঝতে হবে, সন্তানের ভবিষ্যৎ শুধু জিপিএ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। একজন সৎ, দায়িত্বশীল, সহানুভূতিশীল এবং আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠাই শিক্ষার সর্বোচ্চ সাফল্য। আর সেই যাত্রায় একজন অনুপ্রেরণাদায়ী শিক্ষক সবচেয়ে বড় সহযাত্রী।
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com