সোমবার ৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

উদ্বোধনেই ইতি : সবুজে ঢাকা ঘাঘট লেক কি শুধু ফটোসেশনেরই অপেক্ষায় ছিল?

আনোয়ার হোসেন, নিজস্ব প্রতিবেদকঃ   |   রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৩৬ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

উদ্বোধনেই ইতি : সবুজে ঢাকা ঘাঘট লেক কি শুধু ফটোসেশনেরই অপেক্ষায় ছিল?
৬৪

৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। সারা দুনিয়া আজ নদী বাঁচাও, জলাশয় রক্ষা করো- এই মর্মে শপথ নেবে। আলোচনা সভা হবে, বক্তারা সুললিত ভাষায় পরিবেশ রক্ষার তাগিদ দেবেন। গাইবান্ধায়ও হয়তো হবে। কিন্তু শহরের বুকে যে ঘাঘট লেক আজ কচুরিপানার সবুজ কাফনে ঢাকা, দুর্গন্ধে ভারী, পরিত্যক্ত- সেই লেকের দিকে কি কেউ তাকাবেন?

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অনেক শহর আছে যারা তাদের নদীকে ভালোবেসেছে, বাঁচিয়েছে এবং নদীর সুবাদে নিজেরাও বেঁচে উঠেছে। প্যারিসের সেইন, লন্ডনের টেমস, ঢাকার বুড়িগঙ্গা— প্রতিটি নদীর সঙ্গে একটি শহরের আত্মার সম্পর্ক। সেই সম্পর্ক ছিন্ন হলে কী ঘটে, গাইবান্ধার ঘাঘট লেক তার জলজ্যান্ত প্রমাণ!

একসময় ঘাঘট ছিল গাইবান্ধার প্রাণভোমরা। শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া সেই স্বচ্ছ জলধারার দুই পাড়ে ছিল জীবনের স্পন্দন— জেলেরা জাল ফেলত, শিশুরা সাঁতার কাটত, নৌকা ভিড়ত ঘাটে। ১৯৯০ সালে নদীর একটি বাঁক কেটে প্রবাহ উত্তরে সরিয়ে নেওয়ার পর থেকেই শুরু হয় এই ট্র্যাজেডি। প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ অংশ মূল প্রবাহ হারিয়ে পরিণত হয় স্থির জলাশয়ে। আর স্থির জল মানেই ধীরে ধীরে মৃত্যু। সেই মৃত্যুকে ঠেকানোর কোনো সত্যিকারের চেষ্টা তিন দশকেও হয়নি।

২০১৭-১৮ অর্থবছরে এলজিইডির অর্থায়নে বরাদ্দ হলো প্রথমে পনেরো কোটি পঞ্চাশ লাখ, যা পরে বেড়ে দাঁড়াল প্রায় আটাশ কোটি টাকায়। সেতু, সিঁড়িঘাট, ওয়াকওয়ে, ফুটপাত, আলো, গাছ— কাগজে-কলমে পরিকল্পনাটি ছিল সত্যিই উচ্চাভিলাষী। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৯ সালের জুনে। তারপর মেয়াদ বাড়ল, কাজ থামল, আবার চলল। শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালের জুনে কাগজে-কলমে সমাপ্তি টানা হলো— অথচ বাকি রয়ে গেল প্রায় দুই কিলোমিটার কাজ। দুই পাড়ের অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা যায়নি বলে সেই অংশে কাজে হাতই দেওয়া সম্ভব হয়নি।

এখন সরেজমিনে গেলে যা চোখে পড়ে তা হৃদয়বিদারক। দুটি সেতু উঠেছে ঠিকই, কিন্তু সন্ধ্যায় ওয়াকওয়েতে পর্যাপ্ত আলো নেই। সিঁড়িঘাটে শ্যাওলার পুরু আস্তর, বেঞ্চগুলো ভাঙার পথে, বিশাল অংশে ওয়াকওয়ে তৈরিই হয়নি। আর পুরো লেক জুড়ে কচুরিপানার সবুজ গালিচা- যার নিচে চাপা পড়ে আছে প্লাস্টিক, পলিথিন, পচা বর্জ্যের বিশাল স্তূপ।

আটাশ কোটি টাকা গেল কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছেন না কেউ। এলজিইডির তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, ঠিকাদারকে এক কোটি কম দেওয়া হয়েছে— কিন্তু অসমাপ্ত কাজের পরেও কেন বিল ছাড় হলো, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যান তিনি। বর্তমান কর্মকর্তা বলছেন যোগদানের আগেই ঘটনা ঘটেছে। পৌরসভা বলছে কাজ শেষ না হওয়ায় তারা লেক বুঝে নেয়নি। ঠিকাদারের মোবাইল বন্ধ। এই দায়বদ্ধতাহীনতার চিত্রটি শুধু একটি প্রকল্পের ব্যর্থতার গল্প নয়- এটি আমাদের আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতির এক নিষ্ঠুর দলিল।

প্রকল্প ব্যর্থ হলে নতুন উদ্যোগ- তবে সেই উদ্যোগের স্বরূপটি বড় চেনা। ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার যৌথ উদ্যোগে ঘটা করে উদ্বোধন হলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানের। মঞ্চ বাঁধা হলো, মাইক লাগল, কর্মকর্তারা সারি বেঁধে বসলেন। বক্তৃতায় প্রতিশ্রুতি এলো- এটি শুধু একদিনের পরিষ্কার নয়, আগামী দিনেও লেক পরিষ্কার রাখা হবে। ক্যামেরায় ছবি উঠল, পত্রিকায় সংবাদ ছাপা হলো। তারপর নিস্তব্ধতা।

মাত্র দেড় বছরের ব্যবধানে ২০২৬ সালের ১৮ এপ্রিল একই মঞ্চায়নের পুনরাবৃত্তি। নতুন জেলা প্রশাসক, নতুন বক্তৃতা, ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিবেশ রক্ষার নামে সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচির আশ্বাস। সব এনজিও, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এলো। এবারও পরদিন থেকেই নিভে গেল অভিযানের আলো। দেড় বছরে দুটি পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উদ্বোধন হলেও- লেকের চেহারা বদলায়নি এক বিন্দুও।

লেকপাড়ের দোকানদারের কণ্ঠে আক্ষেপ কেবল একজন মানুষের নয়- এটি বারবার প্রতারিত হওয়া একটি জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত হতাশার প্রতিধ্বনি। ‘যেটুকু কচুরিপানা সরানো হয়, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আবার ভরে যায়। নিয়মিত বরাদ্দ নেই, স্থায়ী জনবল নেই, যন্ত্রপাতি নেই। তাহলে এই পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উদ্বোধনী আয়োজন কার জন্য? কার স্বার্থে?’

ঘাঘট লেকের সংকট শুধু কচুরিপানা বা অসম্পূর্ণ প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দশকের পর দশক ধরে লেকের দুই পাড়ে গড়ে উঠেছে সরকারি-বেসরকারি নানা স্থাপনা— পাকা বাড়ি, ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠান, সবই জলাশয়ের জমি দখল করে। পুরাতন ব্রিজের ওপর দাঁড়ালে এই দখলদারি যে কেউ খালি চোখে দেখতে পান। কিন্তু প্রশাসন দেখেও দেখে না। রাজনৈতিক প্রশ্রয় না থাকলে এই দখলদারি এতদিন টিকত না।

দখলের পাশাপাশি প্রতিদিন চলছে নিরবচ্ছিন্ন দূষণ। গৃহস্থালি বর্জ্য, বাজারের পচনশীল আবর্জনা, হাসপাতালের বর্জ্য- সব এসে মেশে লেকের পানিতে। কোনো নজরদারি নেই, জরিমানার ব্যবস্থা নেই, প্রতিরোধের উদ্যোগ নেই। ফলে লেকের সত্তর থেকে আশি শতাংশ পৃষ্ঠ কচুরিপানায় ঢাকা, বর্ষায় শহরে তীব্র জলাবদ্ধতা, প্রতি মৌসুমে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি বাড়ছে এবং একসময়ের মাছে ভরা লেকে এখন মাছের অস্তিত্ব শূন্যের কোঠায়। একটি জলাশয়ের মৃত্যু মানে শুধু পানির মৃত্যু নয়- এটি একটি পরিবেশব্যবস্থার বিপর্যয়, একটি শহরের স্বাস্থ্যের অবনতি, একটি জনগোষ্ঠীর জীবনমানের অধোগতি।

ঘাঘট লেকের সমস্যা জটিল, কিন্তু অসমাধানযোগ্য নয়। বাংলাদেশেই এমন নজির আছে যেখানে মৃতপ্রায় জলাশয় পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। প্রয়োজন- অবৈধ দখল উচ্ছেদে রাজনৈতিক উদ্যোগ, বর্জ্য নিক্ষেপ বন্ধে সারা বছর কার্যকর টহল ও জরিমানা, যন্ত্রচালিত পদ্ধতিতে কচুরিপানা নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী জনবল, পৌর বাজেটে লেক রক্ষণাবেক্ষণে বরাদ্দ এবং স্কুল-কলেজ ও সামাজিক সংগঠনকে যুক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি নাগরিক সচেতনতা কার্যক্রম। এগুলো নতুন পরামর্শ নয়- বিশেষজ্ঞরা বছরের পর বছর বলে আসছেন, নাগরিক সংগঠনগুলো দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু যেন শোনার মানুষ নেই।

আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবসে জাতিসংঘ আহ্বান জানাচ্ছে প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দেওয়ার। বাংলাদেশেও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা আয়োজন হবে। কিন্তু এই দিবস পালনের আলো কি গিয়ে পৌঁছায় গাইবান্ধার ঘাঘট লেকে? পৌঁছায় কি রাজশাহীর বাঘা বিলে, সিলেটের হাকালুকি হাওরের ক্ষয়িষ্ণু প্রান

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us

ফলো করুন bangladoinik.com-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
ফখরুল ইসলাম
সহসম্পাদক
মো: মাজহারুল ইসলাম
Address

জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com