মোঃ মাজহারুল ইসলাম | সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬ | প্রিন্ট | ৪৫ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
একজন সুস্থ মানুষ যখন শরীরে কোনো অস্বস্তি অনুভব করেন, তখন অনেক সময় শারীরিক লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগেই তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। উদ্বেগ, ভয়, লজ্জা বা হীনমন্যতা তার মনে জায়গা করে নেয়। ফলে রোগ শুধু শরীরেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা মনকেও আঘাত করে। এই মানসিক ভাঙনই অনেক সময় রোগের তীব্রতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। সহজ কথায়, রোগ যদি শুধুমাত্র শারীরিক হয়ে থাকতো; তার আরোগ্য, চিকিৎসা খরচ এবং পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সময়ও অনেক কম হত। কিন্তু যখন রোগের সঙ্গে মানসিক ভাঙন যুক্ত হয়, তখন রোগের তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে যায় । শরীরকে সুস্থ করা হয়, কিন্তু মন রয়ে যায় আহত। ফলশ্রুতিতে পুনরা ঐ রোগ আক্রান্ত সম্ভাবনা থাকে, দীর্ঘ চিকিৎসা এবং আর্থিক চাপ বেড়ে যায়।
জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা-রোগ নিরাময়ের কাজ শুধুমাত্র মেডিকেলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। প্রতিটি চিকিৎসাসেবার কেন্দ্রে, সরকারি, আধাসরকারি বা বেসরকারি, রোগী কাউন্সেলরের উপস্থিতি আবশ্যক। রোগীর মানসিক অবস্থা বোঝা, তাকে রোগ সম্পর্কে বাস্তবধর্মীভাবে অবগত করা, তাকে মানসিকভাবে সাহস জোগানো এবং চিকিৎসা গ্রহণে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করা, এসবই দ্রুত আরোগ্যের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। এমনকি পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা, এসব কাজ রোগীকে মানসিকভাবে শক্ত করে, যাতে সে শারীরিক চিকিৎসার সুফল দ্রুত এবং স্থায়ীভাবে পেতে পারে। প্রাইভেট চেম্বারেও রোগী কাউন্সেলিংকে পেশাগত সেবা হিসেবে বিবেচনা করে গ্রহণ করা উচিত। রোগীর মঙ্গলার্থে এর জন্য একটি যৌক্তিক চার্জ রাখা যেতে পারে, এটি কোনো বিলাসিতা নয়, বরং চিকিৎসা ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য উপাদান।
আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রচলিত কটি কুসংস্কার রয়েছে, ‘মানসিক রোগ মানেই পাগল’ এ ধরনের বাজে ধারণা এখনও আমাদের সমাজে প্রচলিত রয়েছে। এই ধারণাকে দূর করা দরকার খুবই প্রয়োজ। আমাদের মনে রাখতে হেবে, মানসিক স্বাস্থ্য একটি দক্ষতা এবং রক্ষা করার মতো সম্পদ। প্রত্যেকটি পরিবারের সদস্যকে জেনে নেয়া উচিত, তাদের মানসিক অবস্থা কেমন। সন্তান, পিতা-মাতা, পত্নী/স্বামী-যত্নশীলতা এবং সময় দিলে অনেক মনসংক্রান্ত সমস্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব। স্কুল, কলেজ, কর্মক্ষেত্র ও কমিউনিটি লেভেলে মানসিক সচেতনতা বাড়াতে হবে; ছোট থেকেই মানসিক সুস্থতা সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে।
প্রশাসন এবং স্বাস্থ্যের নীতি-নির্মাতাদেরও এখানে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। প্রত্যেক হাসপাতাল, ক্লিনিক ও কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবায় কাউন্সেলিং সেবা আইনগতভাবে অথবা নীতিগতভাবে বাধ্যতামূলক করা উচিত। মা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্র, ডায়াবেটিস ক্লিনিক, মলূতঃ যেখানেই রোগী আসে, সেখানে অন্ততঃ একটি মানসিক সহায়তা ইউনিট থাকা প্রয়োজন। আর্থিকভাবে দুর্বল রোগীদের জন্য কাউন্সেলিং সেবা টার্গেটেড সাবসিডি দিয়ে দেয়া যেতে পারে, যাতে আর্থিক বাধা মানসিক সেবা গ্রহণে অন্তরায় না হয়।
ফলে, মানুষকে সুস্থ বলতে গেলে শুধু তার শরীরই নয়-মনের সুস্থতাকেই আমরা প্রধান্য দিতে হবে। মন হয়তো চোখে দেখা যায় না, কিন্তু তার প্রভাব শরীরের প্রতিটি কোষে বিরাজমান। রোগের আগে মনকে শক্ত করে দিলে রোগ জীবনে আঘাত হানতে পারবে না বা আঘাতকালের তীব্রতা অনেকাংশে কমে যাবে। অল্প দৃষ্টান্ত দিলে বোঝা যায়-কাউকে শারীরিক রোগের বিষয়ে আদৌ অবগত না করে লজ্জায় রাখলে সে চিকিৎসা অজুহাতে বন্ধ করে দিতে পারে। কিন্তু যদি তাকে মানসিকভাবে বোঝানো হয়, কিয়ামতেও সে নিয়ম মেনে চলবে।
শারীরিক স্বাস্থ্য বলতে আমরা যে ছবিটা আপাতঃ দৃষ্টিতে দেখি, সেটি অসম্পূর্ণ। সম্পূর্ণ আরোগ্যের পথ হলো মনের আর শরীরের সমন্বয়। পরিবার, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠা ও নীতিনির্ধারক-তিনটি স্তম্ভেই মানসিক সুস্থতার গুরুত্ব স্বীকৃতি পেলে আমাদের সমাজ দ্রুত সুস্থতা অর্জন করবে এবং রোর থেকে রোগী গওয়ার মাত্রার বোঝা কমবে। এজন্য এখনই সময়: কুসংস্কার নাড়িয়ে ফেলা, রোগী কাউন্সেলিংকে নিয়ম করে দেয়া, পরিবারে মানসিক চেকলিস্ট চালু করা, এসবই হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের বীজ।
আমি একজন জনস্বাস্থ্য পেশাজীবী ও সমাজকর্মী হিসেবে মনে করি, প্রতিটি হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে রোগী কাউন্সেলিং ব্যবস্থা থাকা এখন সময়ের দাবী। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও একে অপরের মানসিক অবস্থার প্রতি সচেতন হতে হবে। কারণ সত্যিকার সুস্থতা তখনই সম্ভব, যখন মানুষ শারীরিক ও মানসিক-উভয় দিক থেকেই সুস্থ থাকে।
মোঃ মাজহারুল ইসলাম
কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য পেশাজীবী ও সমাজকর্মী
চাইল্ড এন্ড পেরেন্টে এবং মেন্টাল হেলথ্ কাউন্সিলর (ট্রেনি)
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com