আনোয়ার হোসেন | বুধবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২৪ | প্রিন্ট | ৯০ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
গাইবান্ধা জেলার মোট ভৌগোলিক এলাকার ৩৫ শতাংশ এলাকা তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনার নদীর চরাঞ্চল। এ জেলার সাত উপজেলার ৮২টি ইউনিয়নের মধ্যে সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার ২৮টি ইউনিয়নের ছোট- বড় ১৭১টি চর-গ্রাম প্রায় ৪ লক্ষাধিক মানুষের বসবাস।
প্রতি বছর নদী ভাঙনে চরের সংখ্যা কমবেশি জনবসতির সংখ্যা তেমর কমবেশি হয় না। জীবন ও জীবিকার তাগিদে অস্থায়ীভাবে বিভিন্ন চরেই বসবাস করতে হয়। কৃষিনির্ভর চরের মানুষের বন্যা পরবর্তী জমি দখলের মহড়া চলে। এই নিয়ে হতাহতের ঘটনাও ঘটে। চরাঞ্চলে এখন ভুট্টা, মরিচ, বাদাম, মিষ্টি আলু এবং ইরিসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির ব্যাপক চাষাবাদ হওয়ায় বেশ দৃষ্টিও থাকে দখলদারদের। গোষ্ঠীর জনসংখ্যা আর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বন্যা পরবর্তী দখলে নিচ্ছে চরের জমি।
জেলার কাপাসিয়া, কুন্দেরপাড়া, মোল্লারচর, এরন্ডোবাড়ি, কালাসোন, কাবিলপুর, খাটিয়ামারী, ফজলুপুর, খারজানি, গাবগাছি, টেংরাকান্দি, খঞ্চাপাড়া, কালুরপাড়া, দিঘলকান্দি এবং পাতিলবাড়িসহ ৫০টি জেগে ওঠা চরের দখলদারিত্ব নিয়ে চলে মহড়া এবং পেশি শক্তির দাপট। রেকর্ডধারী জমি নদীতে বিলীন হলে সেটি চলে যায় চরের কিছু প্রভাবশালী মাত্তাব্বর এবং দখলদারের কজায়। আর দখল নিয়ে চলে পেশি এবং বংশশক্তির মহড়া। চরাঞ্চলে গত ৩ দশকে খুন হয়েছেন অর্ধশত মানুষ।
আর সহায়-সম্পদ, গরু-ছাগল লুটের ঘটনাও অসংখ্য। আর মামলাও হয়েছে শতাধিক। তবে এসব ঘটনায় ফৌজদারী মামলা এবং দেওয়ানী মামলা হলেও কার্যত খুব একটা সমাধান হয় না, বরং উল্টো জমি বেদখলে চলে যায়। গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কালুরপাড়া চরের আব্দুল আজিজ মোল্লা জানান, গত ২০ বছর আগে নদীভাঙনে আমাদের বংশের বেশির ভাগ লোকই বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। আমাদের মোল্লা বংশের ৪টি পরিবার এই চরে বসবাস করছি।
বন্যার পর কিছু জমিতে শস্য চাষাবাদ করা যায়, কিন্তু অন্য লাঠিয়াল বাহিনীর দাপটে জমির সীমানা নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। এজন্য জমি থাকলেও দখলে নেই বলে তিনি জানান। জেলার ফুলছড়ি উপজেলার ফজলুপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদিন জালাল জানান, চরের জমি চলে গোষ্ঠী বা বংশের প্রভাবে।
এখানে জমি নদীতে চলে গেলে খাস হয়ে যায়। এই কারণে কার জমি ছিল সেটি বড় কথা নয়, বড় কথা হলো দখল যার জমি তার। গাইবান্ধা সদর উপজেলার কুন্দেরপাড়া চরের মিয়াজান আলী জানান, নদীভাঙনে বাড়িঘর টানাটানিতে বিভিন্ন চরে যেতে হয় এবং নদীতে বিলীন জমিগুলো জেগে উঠতেও সময় লাগে। নতুন প্রজন্মের আর জমি এতমাথা ব্যাথা নেই।
এই কারণে জমিগুলো ফিরে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। চরের বেশির ভাগ মানুষ জানান, রেকর্ডকৃত জমি নদীতে বিলীন হয়ে কয়েক বছরের মধ্যে তা উঠলেও এর সীমানা নির্ধারণ নিয়ে জটিলতায় পড়তে হয়। এই জন্য আশ্রয় নিতে হয় প্রভাবশালী ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে। সিকস্তী এবং পয়স্তির গ্যারাকলে অনেক সময় জমির মালিকানাও হারাতে হয়। চরের জমিজমা নিয়ন্ত্রণ করেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং দেওয়ানী- মাত্তব্বররা। ইদানিং রাজনৈতিক পরিচয়েও চর দখল করছেন অনেকেই।
আবার মেইনল্যান্ড থেকে কতিপয় রাজনৈতিক ব্যক্তি বেশ কিছু চর নিয়ন্ত্রণ করছেন। তারা বিভিন্নজনের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে চরে চরে গড়ে তুলেছেন লাঠিয়াল বাহিনী। চরাঞ্চলে মোট ৬ লাখ ২৯ হাজার হেক্টর আবাদি-অনাবাদি জমি রয়েছে। নদীভাঙন হলে আবাদি জমির পরিমাণ কোন মৌসুমে বৃদ্ধি পায় আবার কোন সময় বালু পড়ে হ্রাস পায়। এভাবে আর কত দিন? চরে জমির মালিকানা থেকেও যখন জমি ভোগ করতে পারেন না, তখন কার কাছে অভিযোগ করবেন?
এই আক্ষেপ ভুক্তভোগীদের। এই বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধা জেলা বারের প্রবীণ আইনজীবী পরেশ চন্দ্র জানান, জমিজমা নিয়ে মামলা হয়, তবে চরের জমি নিয়ে খুব বেশি একটা মামলা হয় না। চরের জমি নিয়ে ফৌজাদারি মামলাই বেশি হয়। গাইবান্ধা জেলা পুলিশ সুপার মোশাররফ হোসেন জানান, চরের জমি দখল নিয়ে কেউ কোন অভিযোগ করেন না। তবে অভিযোগ করলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com