ডা. এস. এম. নওশের: | মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৫ | প্রিন্ট | ১০২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
সৈয়দ মুজতবা আলি খুব বেশি ছোটগল্প লেখেননি। কিন্তু যেগুলো লিখেছেন, প্রতিটিই যেন সমাজের অন্তর্লুকানো অন্যায়কে ব্যঙ্গের ছুরিতে কেটে দেখায়। তাঁর একটি গল্প—‘পাদটীকা’, একসময় আমাদের ক্লাস সেভেনের পাঠ্য ছিল। এখনকার পাঠ্যবইয়ে আছে কি না, জানি না।
গল্পের কেন্দ্রবিন্দু এক পণ্ডিত শিক্ষক। একদিন আসামের প্রাদেশিক গভর্নর স্কুল পরিদর্শনে আসেন। পণ্ডিত মশাই দেখলেন, গভর্নরের সঙ্গে একটি কুকুর এসেছে—যার পা তিনটি। পরে জানলেন, ঐ তিন ঠেংগা কুকুরটির পেছনে মাসে খরচ হয় ৭৫ টাকা।
(তখনকার সময়ে যখন চালের মণ তিন–চার টাকায়, তখন এই টাকা এক বিশাল অঙ্ক।)
সেই অঙ্ক, যা এখনো অমীমাংসিত
একদিন পণ্ডিত মশাই লেখককে ক্লাসে অঙ্ক দিলেন—
“সাহেবের তিন ঠেংগা কুকুরের পিছে মাসিক খরচ ৭৫ টাকা।
তাহলে এক ঠেংগার পিছে খরচ কত?”
লেখক বিনা দ্বিধায় বললেন—২৫ টাকা।
পণ্ডিত মশাই তখন শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন—
“আমি এক ব্রাহ্মণ শিক্ষক। আমার পরিবারে আটজন সদস্য।
আমার মাসিক বেতন ২৫ টাকা।
বলো, আমার পরিবার সেই কুকুরের কয় ঠেংগার সমান?”
এই প্রশ্নেই যেন জমে আছে শতাব্দীর অপমান।
শিক্ষকের মুখে বিষাদ, আর তার পেছনে সমাজের শ্রেণিবিভেদ, অসম বেতন আর অবহেলার ইতিহাস।
শত বছর পেরিয়ে দৃশ্যপট একই
ব্রিটিশ চলে গেছে, আমরা স্বাধীন হয়েছি—কিন্তু শিক্ষকের মর্যাদায় খুব একটা পরিবর্তন আসেনি।
আজও দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সীমিত বেতনে টানাটানির সংসার চালান। এমপিওভুক্তরা সরকারি বেতন পেলেও নন-এমপিও শিক্ষকরা যেন আধা-অনাহারে বেঁচে থাকা এক শ্রেণির মানুষ।
আমার কাছে নিয়মিত ভিজিটে আসেন এমন দুইজন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ একসময় শিক্ষক ছিলেন।
শিক্ষকতা ছেড়ে ওষুধ কোম্পানিতে যোগ দিয়েছেন—শুধু পরিবারের মুখে একটু নিশ্চিন্ত ভাত তুলে দেওয়ার জন্য।
প্রেসক্লাবের সামনে অনশনরত শিক্ষকরা
আমি যখন সেগুনবাগিচার হাসপাতালে কাজ করতাম, প্রায়ই প্রেসক্লাবের সামনে শিক্ষক আন্দোলন দেখতাম।
কেউ অনশন করছেন, কেউ প্ল্যাকার্ড হাতে বসে আছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে কেউ আসেননি তাদের অনশন ভাঙাতে।
বরং কেউ কেউ অনশন করতে করতেই মৃত্যুবরণ করেছেন—তবু শিরোনামে জায়গা হয়নি তাদের নামের।
ক্ষমতার পালাবদল হলে শিক্ষকরা নতুন আশায় বুক বাঁধেন—“এবার হয়তো আমাদের কথাও কেউ শুনবে।”
কিন্তু প্রতিবারই তারা ফিরে যান একই পরিণতির দিকে—উপেক্ষা আর অবমাননার বাস্তবতায়।
আজও প্রেসক্লাবের সামনে দেখা যায়, শিক্ষকেরা বসে আছেন দাবি নিয়ে,
আর পুলিশ—যারা নিজেরাও কোনো না কোনো শিক্ষকের প্রাক্তন ছাত্র—বলপ্রয়োগে তাদের সরিয়ে দেয়।
আলোচনার টেবিলে আসুন
সমস্যা এমন কিছু নয় যা আলোচনায় মীমাংসা করা যায় না।
প্রয়োজন কেবল সদিচ্ছা।
আমাদের শিক্ষা উপদেষ্টারা, নীতিনির্ধারকরা—তাদের এখনই উচিত সব স্তরের শিক্ষকদের নিয়ে আলোচনায় বসা, তাদের অভাব–অভিযোগ মনোযোগ দিয়ে শোনা।
মনে রাখবেন—
আপনার পদ, আপনার প্রভাব, আপনার ক্ষমতা—সবকিছুর ভিত্তি একজন শিক্ষক।
যার হাতে আপনি প্রথম অক্ষর শিখেছিলেন, যিনি আপনাকে মানুষ হতে শিখিয়েছিলেন।
শেষ কথা
হাজারো তরুণ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা কেবল এসির ঠান্ডা হাওয়া খাওয়ার বা নরম গদির আরামে ডোবার জন্য নয়।
শিক্ষকদের অবমাননা মানে জাতির আত্মসম্মানকে আঘাত করা।
কাজ করুন।
সমস্যার সমাধান করুন।
না পারলে অন্তত সম্মান নিয়ে বিদায় নিন।
কারণ—
আপনিও কারো না কারো ছাত্র ছিলেন।
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com