নিজস্ব প্রতিবেদক | শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ২১ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
আজ ৭ নভেম্বরঃ ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ঘটনাবহুল দিন ৭ নভেম্বর। জাতীয় স্বাধীনতা,সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডতা সুরক্ষার অনন্য প্রতীক ‘ জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস।’ সেই দিন সিপাহী জনতার ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে দেশপ্রেমের যে বিরল নজীর স্থাপিত হয়েছিল তা আজো প্রেরণার উৎস হয়ে আছে। ইতিহাসের নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে দেশ আজ স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় সামিল হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশকে একটি উন্নত এবং কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করা। ৭ই নভেম্বর আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী একটি দিন যা আমাদের ইতিহাসকে বদলে দিয়েছিল।
৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান কোন সাধারণ সামরিক অভ্যুত্থান মাত্র ছিল না। এর তাৎপর্য ছিল অনেক গভীরে লুকায়িত। ৭ই নভেম্বর সিপাহী-জনতার সম্মিলনে যে অভুতপূর্ব অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল তা ছিল বিক্ষুব্ধ সাধারণ সিপাহী এবং বঞ্চিত জনতার অভুতপূর্ব সম্মিলনের কাহিনী। সেদিনের ঢাকা অভিমুখে সিপাহী-জনতার সেই ঐতিহাসিক মিছিল শুধু ক্ষমতার পালা বদলের লড়াই ছিল না, সেটি ছিল বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা,স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য গণপ্রতিরোধ।
১৯৭৫ সালের এই দিনে সেনাবাহিনীতে পাল্টাপাল্টি অভ্যুত্থান ও ক্ষমতার পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। কতিপয় ও ৭১ এর রানাঙ্গনের অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের দ্বারা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বপরিবারে নিহত হবার পর শেখ মুজিব সরকারের তেইশ জন মন্ত্রীর একুশ জনকে সাথে নিয়ে খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। কিন্তু খন্দকার মোশতাকের ক্ষমতার নেপথ্যে ছিলেন ১৫ই আগস্টের ঘটনার মূল নায়কেরা। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ এই ব্যাপারটি মেনে নিতে পারেননি। তিনি তার অনুগত সৈন্য বাহিনী নিয়ে ৩রা নভেম্বর মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান ঘটান। অভ্যুত্থানটি প্রাথমিক ভাবে সফলও হয়। কিন্তু তার স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ৩ দিন। বস্তুত খালেদ মোশাররফ রক্তপাত এড়াতে চেষ্টা করেছিলেন, যা পরবর্তীতে তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
৩রা নভেম্বরের অভ্যুত্থানে জেনারেল খালেদ মোশাররফ রক্তপাতহীন ক্যু করতে গিয়ে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তার নিজ বাসভবনে গৃহবন্দী করেন। কর্নেল (অবঃ) আবু তাহের সে সময় নারায়ণগঞ্জ অবস্থান করছিলেন। কর্নেল তাহের ছিলেন জিয়াউর রহমানের একজন বিশেষ শুভাকাঙ্ক্ষী। তিনি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। সৈনিক-অফিসার বৈষম্য তার পছন্দ ছিলনা। তার এই নীতির জন্য তাহের সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকদের মাঝেও দারুণ জনপ্রিয় ছিলেন। কর্নেল তাহের বিশ্বাস করতেন জিয়াও তারই আদর্শের লোক।
জিয়াউর রহমান তার বাসভবনে বন্দী হয়ে থাকেন। খালেদ মোশারফের নির্দেশে তাকে বন্দী করে রাখেন তরুণ ক্যাপ্টেন হাফিজুল্লাহ। জিয়ার বাসার টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। কিন্তু ক্যাপ্টেন হাফিজুল্লাহ একটি ভুল করেন। তিনি ভুলে যান বেডরুমেও একটি টেলিফোন আছে। জিয়া কৌশলে বেডরুম থেকে ফোন করেন তাহেরকে। খুব সংক্ষেপে বলেন “সেভ মাই লাইফ”।
কর্ণেল (অবঃ) তাহের জিয়ার আহ্বানে সাড়া দেন। তিনি ঢাকাতে তার অনুগত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিপাহীদের পাল্টা প্রতিরোধ গড়ার নির্দেশ দিয়ে নারায়ণগঞ্জ চাষাড়া থেকে ঢাকা রওনা হন, এ সময় তার সফর সঙ্গী ছিল শত শত জাসদ কর্মী। কর্নেল তাহেরের এই পাল্টা অভ্যুত্থান সফল হয় ৭ই নভেম্বর। কর্নেল তাহের, জিয়াউর রহমানকে বন্দী দশা থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসেন। ঐ দিনই পাল্টা অভ্যুত্থানে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা জেনারেল খালেদ মোশাররফকে হত্যা করে।
কথা ছিল, জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের করে আনা হবে। তারপর জাসদের অফিসে তাকে এনে তাহেরদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হবে। পরে সিপাহী-জনতার এক সমাবেশ হবে। সেখানে বক্তব্য রাখবেন জিয়াউর রহমান আর কর্ণেল (অবঃ) তাহের। কিন্তু মুক্ত হওয়ার পরে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। জিয়াউর রহমান ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হতে সম্মত হন না। ঊর্ধ্বতন সামরিক অফিসাররা তাকে পরামর্শ দিতে থাকেন। তাহের জিয়াকে ভাষণ দিতে বলেন। জিয়াউর রহমান ভাষণ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
তাহের বুঝতে পারেন জিয়া তাদের সাথে আর থাকছেন না। তিনি পুনরায় সংগঠিত হতে থাকেন। কিন্তু জিয়া বুঝতে পারেন ক্ষমতায় টিকতে হলে তাহেরসহ জাসদকে সরাতে হবে। সেই অনুযায়ী গ্রেফতার হতে থাকেন জাসদের সব নেতারা। তাহেরও গ্রেফতার হন। শুরু হয় এক প্রহসনের এক বিচার। গোপন আদালতে চলতে থাকে সেই বিচার
১৯৭৬ সালের ২১শে জুলাই কর্নেল তাহেরের ফাঁসি হয়। অন্যান্য নেতাদের বিভিন্ন মেয়াদের জেল হয়। ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের কারিগর ছিলেন তাহের। আর তার ফলে ক্ষমতায় বসেন জিয়া। “বিপ্লব ও সংহতি” -শব্দটি সাধারণত সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের স্লোগান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
সেদিন বন্দী থাকা তৎকালীন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সিপাহি-জনতা ও সর্বস্তরের মানুষ এক ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুক্ত করে এনেছিলেন। দেশের মানুষের আস্থা, ভালোবাসা ও আবেগ ধারণ করে জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে তিনি দেশে ঐক্য, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।
দিনটিকে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দল বিএনপি তথা বর্তমান জাতীয় সংসদের সরকারি দল এবং জাতীয় সংসদের
বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী দিনটিকে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ‘সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান’ হিসেবে পালন করছে। অন্যদিকে
৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের সঙ্গে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নামও জড়িয়ে আছে। জাসদ দিনটিকে ‘সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে পালন করে এবং বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি দল ও সংগঠন দিনটিকে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করেছিল।
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com