শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

আয়নায় তাকান, নূরজাহান আমাদেরই গল্প

মোঃ মাজহারুল ইসলাম:   |   বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৩৫ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

আয়নায় তাকান, নূরজাহান আমাদেরই গল্প
৬৭

মিরপুরের সেই ফ্ল্যাটের দরজা যখন খুলল, তখন যা বেরিয়ে এলো তা কেবল একটি পচা মৃতদেহের দুর্গন্ধ নয়। বেরিয়ে এলো আমাদের বর্তমান সভ্যতার একটি পচা সত্য।

৭৫ বছরের নূরজাহান বেগম মারা গেছেন একা, নোংরায়, পোকায়। দরজার হুকে ঝুলানো পলিব্যাগে রুটি। সন্তানরা মাঝে মাঝে রেখে যেত। ভাবখানা এমন যেন মানুষ না, একটি পোষা প্রাণীকে খাওয়ানো হচ্ছে। রান্নাঘরের বাসনে ১০-১২ বছরের ময়লার স্তর। মানে এই মায়ের কাছে কেউ বসে ভাত খায়নি এক যুগ ধরে।

আর সন্তানরা? একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। একজন কানাডাপ্রবাসী ছাত্র। একজন সরকারী যুগ্ম-সচিব। উচ্চশিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত। মায়ের লাশ সামনে রেখে তারা সাংবাদিকের পকেটে গুঁজে দিতে চাইছে টাকা।
শুধু বিচার চেয়ে লেখা শেষ করা সহজ। কিন্তু আমি একজন সার্টিফাইড মেন্টাল হেলথ্ কাউন্সিলর ও সমাজকর্মী হিসেবে সেই সহজ পথে হাঁটতে চাই না। আমি প্রথম প্রশ্ন রাখতে চাই, এই সন্তানরা কি জন্ম থেকেই এমনটি ছিল এরকম?
মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবী হিসেবে আমি জানি, মানুষ হঠাৎ নিষ্ঠুর হয় না। নিষ্ঠুরতা তৈরি হয় ধীরে ধীরে, স্তরে স্তরে।
প্রথমে আসে দূরত্ব। পড়াশোনার জন্য শহরে এলো। তারপর বিদেশে গেল। মায়ের সাথে প্রতিদিনের জীবনের সংযোগটা কমতে কমতে একসময় শুধু ঈদের ফোনকলে সীমিত হয়ে গেল। তারপর আসে স্বাভাবিকীকরণ। প্রথমবার মাকে একা রেখে গেলে অপরাধবোধ হয়। দ্বিতীয়বার একটু কম। দশমবারে আর হয় না। মস্তিষ্ক নিজেকে বোঝায়,মা তো ভালোই আছেন। প্রতিবেশীরা দেখছেন। বৃদ্ধরা একটু এরকমই থাকেন।
তারপর আসে বিচ্ছিন্নতা। একসময় মা একটি সমস্যা হয়ে ওঠেন। জীবনের ছন্দে বিঘœ। ক্যারিয়ার আছে, সংসার আছে, সন্তান আছে, মায়ের জন্য সময় নেই।
আমি বলতে চাচ্ছি, এই তিনটি ধাপ কিন্তু শুধু নূরজাহানের সন্তানদের গল্প নয়। এটি আজকের বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি ক্রমবর্ধমান বাস্তবতা।
আমি দ্বিতীয় প্রশ্ন রাখতে চাই, সমাজের সদস্য হিসেবে আমরা কী শেখাচ্ছি?
আমরা সন্তানদের শেখাই, পরীক্ষায় এ+, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ো, বিদেশে যাও, প্রতিষ্ঠিত হও। কিন্তু কি শেখাই, বৃদ্ধ মানুষের হাত ধরতে? তাদের একাকিত্বের কথা বুঝতে? বার্ধক্যের অসহায়ত্বকে সম্মান করতে? আমাদের পাঠ্যক্রমে নৈতিক শিক্ষা আছে, কিন্তু সম্পর্কের যতেœর শিক্ষা নেই। আমরা শেখাই কীভাবে সফল হতে হয়, কিন্তু শেখাই না কীভাবে মানবিক থাকতে হয়।
বাড়িতেও শেখানো হচ্ছে না। কারণ এই প্রজন্মের বাবা-মা নিজেরাও ব্যস্ত। সন্তানকে সময় দেওয়ার চেয়ে স্ক্রিনটাইম সহজ। নিজেরা যখন বৃদ্ধ বাবা-মাকে অবহেলা করেন, সন্তানরা সেটাই শেখে। আমরা যা করি, সন্তানরা তা দেখে। আমরা যা বলি, তারা কখনো কখনো শোনে।
আমার তৃতীয় প্রশ্ন, কাঠামোগত সংকট কোথায় ?
শুধু ব্যক্তির নৈতিকতাকে দোষ দিলে আমরা বড় সত্যটা এড়িয়ে যাই। বাংলাদেশে প্রবীণদের জন্য কোনো কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো নেই। বৃদ্ধাশ্রম আছে, কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়, সাশ্রয়ী নয়। সামাজিকভাবে এখনো কলঙ্কিত হিসেবে দেখে থাকি। প্রবীণ ভাতা আছে, কিন্তু তা প্রহসনমূলক। কমিউনিটি কেয়ার সিস্টেম নেই। একটি একাকী বৃদ্ধার ফ্ল্যাটে যদি কেউ সপ্তাহে একবারও সরকারি বা এনজিও প্রতিনিধি হিসেবে যেত, নূরজাহানের পরিণতি হয়তো ভিন্ন হতো। উন্নত দেশগুলোতে Adult Protective Services ev Community Aging Support কাজ করে ঠিক এই কারণে, পরিবার না দেখলে রাষ্ট্র দেখে। আমাদের এখানে রাষ্ট্র বলে, ‘পরিবার দেখবে।’ পরিবার বলে, ‘পরে দেখব।’ এই ফাঁকে মানুষ মরে।

আমার চতুর্থ প্রশ্ন, টাকা দিয়ে চাপা দেওয়ার সংস্কৃতি কোথা থেকে এলো?
সাংবাদিকের পকেটে টাকা গোঁজার দৃশ্যটি আলাদাভাবে ভাবায়। এই সন্তানরা জানে তারা অপরাধ করেছে। কিন্তু তাদের প্রথম প্রবৃত্তি অনুতাপ নয়, ঢাকা দেওয়া। কারণ আমাদের সমাজে লজ্জা এবং সম্মান সত্য ও ন্যায় বিচারের চেয়ে বড়। ‘লোকে কী বলবে’, এই ভয়টাই আসল, অপরাধবোধ নয়। যে সমাজে জবাবদিহির চেয়ে ইমেজ রক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেই সমাজে দুর্নীতি, অবহেলা এবং নিষ্ঠুরতা একসাথে বাড়ে।

আমরা এখন কী করব?
শুধু ক্রোধ প্রকাশ করে ফেসবুক পোস্ট বন্ধ করলে নূরজাহানের মৃত্যু অর্থহীন হয়ে যাবে।
আমি একজন সমাজকর্মী হিসেবে কিছু বিষয় তুলে ধলতে চাই। পরিবার পর্যায়ে, আজকেই একবার বাড়ির বড়দের ফোন করুন। জিজ্ঞেস করুন কেমন আছেন, শুধু ‘ভালো আছো’ শোনার জন্য না, সত্যিই জানার জন্য। সমাজ পর্যায়ে, মহল্লায়, ফ্ল্যাটবাড়িতে বৃদ্ধ একাকী মানুষদের একটু চোখে রাখুন। প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া এখন বিলাসিতা নয়, নৈতিক দায়িত্ব। নীতি পর্যায়ে বলতে চাই, প্রবীণ সুরক্ষা আইনের কার্যকর প্রয়োগের চাই। Community-based elder care চাই। স্কুলে সম্পর্ক ও দায়িত্বের শিক্ষা চাই। আইনি পর্যায়ে বলতে চাই, এই মামলা যেন শুধু মিডিয়ার মনোযোগেই না শেষ হয়। বিচার হোক, কিন্তু সেই বিচার যেন ভবিষ্যতের জন্য নজির তৈরি করে।

নূরজাহান বেগম তাঁর সন্তানদের মানুষ করেছিলেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল তারা বড় হবে, ভালো থাকবে। তারা বড় হয়েছে। ভালোও হয়তো আছে। কিন্তু মানুষ হয়নি। এই ব্যর্থতা তাদের একার নয়। এই ব্যর্থতায় আমাদের পরিবার, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, আমাদের রাষ্ট্র আমি মনে করছি, সবার অংশ আছে।

দরজার হুকে ঝুলানো পলিব্যাগের রুটিটা আসলে আমাদের সমাজের একটি রূপক। আমরা আমাদের বৃদ্ধদের দিচ্ছি ন্যূনতম টিকিয়ে রাখার জন্য, ভালোবাসার জন্য নয়। দায়িত্ব বা কর্তব্যেও জন্যও নয়। আমাদের এখনই নূরজাহান’কে নিয়ে ভাবতে হবে, বৃদ্ধদের সুরাক্ষায় বা নিরাপত্তা বা সু খবা আনন্দময় জীবন গঠনে সঠিক ও অর্থবহ পলিসি গ্রহণ করতে হবে।

লেখক : মোঃ মাজহারুল ইসলাম
সমাজকর্মী ও কলামিস্ট
সার্টিফাইড মেন্টাল হেলথ্ কাউন্সিলর

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us

ফলো করুন bangladoinik.com-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
ফখরুল ইসলাম
সহসম্পাদক
মো: মাজহারুল ইসলাম
Address

জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com