মোঃ মাজহারুল ইসলাম: | সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬ | প্রিন্ট | ৬২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
আজকের প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা আগের দিনের চাইতে ভিন্ন-তারা তথ্যসংবহুল, সংবেদনশীল এবং পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে নিজের অবস্থান দাবি করে। এ পরিবর্তনগুলোকে কেবল ‘অনৈক্য’ বা ‘অসভ্যতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা চলে না। সমস্যা লুকোচুরি করার চেষ্টা করলে তা বাড়ে; কঠোর শাসন, অপূর্ণ চাহিদা, আর বোঝাপড়ার অভাব নানান মানসিক সংকট রচনা করে। কখনো হতাশা, কখনো বা আত্মহত্যার মতো অমঙ্গলকর সিদ্ধান্ত পর্যন্ত পৌঁছতে দেখা যায়।

এখানে দায় একতরফা নয়। একদিকে অভিভাবকরা সন্তানদের জন্য উদ্বিগ্ন; যখন তাদের প্রচেষ্টা বোঝা হয় না-তারা হতাশ ও কষ্টে ভুগে। অন্যদিকে শিক্ষকরা-সংগঠন ও শৃঙ্খলার রক্ষার্থে-দায়িত্বশীলভাবে কঠোর হতে পারেন; কিন্তু প্রয়োজনে কোমলতা, বোঝাপড়া ও সহানুভূতির অভাবও দেখা যায়। আর ছাত্র-ছাত্রীরা, তাদের অভিরুচি ও মানসিকতার পরিবর্তনের সাথে তাল মিলাতে না পারায় বিভ্রান্ত হয়। এই তিন পক্ষ একত্রে না বসলে, শিক্ষার পরিবেশ হবে সংঘাতময় ও অস্থিতিশীল।
সমাধান জটিল নয়: পেশাদার কাউন্সেলিংকে স্কুল-শিক্ষা ব্যবস্থার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তোলা দরকার। শুধু সমস্যা ঘটলে আহবান জানানোর জন্য নয়-প্রতিদিনের শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক সম্পর্ককে সুস্থ রাখার জন্য কাঠামোগত সমর্থন দরকার। একজন প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর -যিনি মানসিক স্বাস্থ্য, শিশুবিকাশ ও অনুশাসন বিষয়গুলো বোঝেন-একদিকে ছাত্র-ছাত্রীর ব্যক্তিগত সমস্যা শনাক্ত করবেন; অন্যদিকে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তুলবেন। একান্ত ব্যক্তিগত কাউন্সেলিং, পিয়ার গ্রুপ সেশন, শিক্ষক ও অভিভাবককে দেওয়া ওয়ার্কশপ-এসব মিলিয়ে একটি প্রশান্ত শিক্ষা পরিবেশ গড়ে ওঠে।
কাউন্সলিং মানে কোন অনর্থক ‘নরম’ নীতি নয়। এটি বাস্তবসম্মত-শিশুর আচরণ পরিবর্তনের জন্য শ্রেণিকক্ষ কৌশল, ক্রমাগত মূল্যায়ন, আচরণগত লক্ষ্য নির্ধারণ এবং পরিবারের সহযোগিতা নির্ধারণ করে। অভিভাবক যখন বুঝতে পারে যে শাসন সবসময় সমাধান নয়, তারা শিক্ষকের প্রতি বিশাল সমর্থন স্বরূপ অভ্যন্তরীণ শান্তি এনে দিতে পারে। শিক্ষক যখন শাসনকে ব্যর্থ মনে করে না, বরং বুঝাপড়ার কৌশল শেখে, শিক্ষার মান বাড়ে। আর ছাত্র-ছাত্রীরা যখন শোনা এবং বোঝা হয়, তারা আত্মসম্মান ফিরে পায়, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস পায়, এবং নেতিবাচক সিদ্ধান্ত থেকে দূরে থাকে।
সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে চাই দ্রুততম সময়ে স্কুল কাউন্সেলিং নীতিমালা গঠন ও প্রয়োগ করা—প্রতিটি বিদ্যালয়ে অন্তত একজন নিবন্ধিত কাউন্সেলর, শিক্ষক শ্রেণার জন্য মানসিক স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ, এবং নিয়মিত পিতামাতার সাথে পরামর্শ সেশন বাধ্যতামূলক করা দরকার। অনলাইন হেল্পলাইন ও রেফারেল ব্যবস্থাও থাকতে হবে যাতে গুরুতর সমস্যা দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসা ও সমর্থনে পৌঁছায়।
বস্তুনিষ্ঠভাবে বললে-শাসন নয়, সংলাপ; দোষারোপ নয়, সমঝোতা; বিচ্ছিন্নতা নয়, সমন্বয়-এই তিনটি মূলনীতি যদি আমরা মানি, দেশ-সমাজ-স্কুলে সুস্থতা ফিরিয়ে আনা সহজ। আজকের ছাত্র হবে আগামী সমাজের ভারসাম্যশীল নাগরিক-শুধু যদি আমরা তাদের কণ্ঠ শোনার দক্ষতা শিখি এবং সেখানে পেশাদার সহায়তা রাখি।
আমি একজন জনস্বাস্থ্য পেশাজীবী ও কাউন্সিলর হিসেবে নিম্নের প্রস্তাবগুলো তুলে ধরতে চাই।
• প্রতিটি স্কুলে কমপক্ষে একজন নিবন্ধিত কাউন্সেলর নিয়োগ।
• শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য বছরে একবার ম্যান্ডেটরি ট্রেনিং ও কর্মশালা।
• নিয়মিত (তিন মাসে একবার) শিক্ষক-অভিভাবক-কাউন্সেলর সম্মেলন।
• ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শনাক্তকরণ ও জরুরি রেফারেল প্রটোকল।
• অনলাইন/ফোনে মানসিক সহায়তা লাইন ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিশ্চিতকরণ।
• পেশাদার কাউন্সিলর যেন ব্যক্তিগত চেম্বার করেন সেই সুযোগ তৈরি করতে হবে
শিক্ষা শুধুই জ্ঞানসঞ্চয় নয়-এটি চরিত্র গঠন। এবং চরিত্র গঠনে উৎসাহ, সমঝোতা ও পেশাদার মেধার সমন্বয়ই স্থায়ী ফল বয়ে আনে। তাই আজই শুরু করা দরকার-শাসনের পরিবর্তে সন্ধানকে উৎসাহ দেয়া।
লেখক : মোঃ মাজহারুল ইসলাম
কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য পেশাজীবী ও সমাজকর্মী
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com