আনোয়ার হোসেন | বুধবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ | প্রিন্ট | ১২৬ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
ডাকঘর নাটকের অমল দইওয়ালার হাঁক শুনে তাকে ডেকে আনে। অমল দই কিনবে না জেনেও দইওয়ালা তার সাথে গল্প করে। রোগের কারণে ঘরে বন্দী বালক কল্পনা করে দূর পাহাড়ের গায়ে পুরনোকালের এক বটগাছের ধারের লাল মাটির গ্রামে শামলী নদীর ধারে মেয়েরা লাল শাড়ি পরে কলসীতে জল তুলে রাখে। পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে দই বেচার স্বপ্নেই তার বন্দীদশার মুক্তি এমন ভাবতে তার আনন্দ হয়। মনসামঙ্গলে দেবী মনসা গয়লানীর ছদ্মবেশ ধারণ করে নগরে আসে। দই বিক্রি যে অন্ত্যজশ্রেণির নারীদের বৃত্তি তা গোয়ালা জাতির জীবিকা নির্বাহের মধ্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। দই আবহমান সময়কাল ধরে বাঙালির জীবনের প্রতিদিনের খাবার,ভোজবাড়ির অন্যতম আকর্ষণ , পেটরোগার পথ্য, পেটুকের ভালোবাসা।
ভালো নাম্বারের আশায় পরীক্ষা দিতে যাবার আগে কপালে দইয়ের ফোঁটা, ভাইফোঁটায় আয়ুবৃদ্ধি কামনায় কপালে দইয়ের ফোঁটা, বিজয়া দশমীর শেষে সাংসারিক সুখ সমৃদ্ধির প্রার্থনায় দরজায় দইয়ের ফোঁটা। এ ছাড়াও বাঙালির বিয়ের অনুষ্ঠানে দই অপরিহার্য। মাছ আর দই ছাড়া আনন্দ অনুষ্ঠান পায় না পূর্ণতা। বাঙালি পেট রোগা হলেও ‘ঘোল খাওয়া’র চেয়ে খাওয়ানোতে আগ্রহী ছিল। বাংলা প্রবচনে ঘোল খাওয়ানোর নিহিতার্থ নাস্তানাবুদ করা। যুগ, বছর, মাস, দিন গড়িয়ে গেছে। পরিবেশগত কারণে জলবায়ু পাল্টেছে।
বর্তমান সময়ের গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর ঠেলায় দ’য়ে পড়া বং গোষ্ঠী তাই স্বাস্থ্যোদ্ধার এর জন্য ঘোলের দিকে ফিরে তাকিয়েছে। নতুন প্রজন্মের কাছে এই গোয়ালা পেশাটি নতুন মনে হলেও তিন থেকে চার দশক আগে পেশাটি ছিল সমৃদ্ধ। তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় বাজারে ভিন্ন স্বাদের দই আসায় কমে গেছে টক দই এর চাহিদা। বিক্রি কমে যাওয়াসহ বাজারে দুধের দাম বেশি থাকায় অনেক গোয়ালা এখন পেশা পরিবর্তন করলেও শতবর্ষ পুরনো এই পেশা ধরে রেখেছেন গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার হরিনাবাড়ী এলাকার গোয়ালা আশরাফ আলী। ৬০বছর বয়সে বাঁকা কাঁধের উপর ভর করে তিনি এখনও গাইবান্ধা জেলার বিভিন্ন স্থানে ফেরি করে টক দই বিক্রি করছেন। তিনি জানান, টক দই তৈরি তাদের পারিবারিক ব্যবসা।

টক দইয়ের সুদিনের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, একটা সময় দিনে শত শত লিটার দুধ থেকে টক দই তৈরি করা হতো। প্রতিদিন ভোরে পাইকাররা আমাদের বাড়িতে এসে টক দই নিয়ে বিক্রির জন্য বিভিন্ন এলাকায় ঘুরত। দিনশেষে সবার খুব ভালো আয় হতো কিন্তু এগুলো এখন অতীত। আমার পাড়ায় একসময় অর্ধ শতাধিক মানুষ এই পেশায় নিয়োজিত থাকলে এখন কেবল দুই তিন জন মানুষ টক দই তৈরি করছে। নতুন করে এই পেশায় কেউ আসতে চাইছে না। জিনিসপত্রের দাম বেশি তাই সব মিলিয়ে লাভ অনেক কম। এসময় তিনি আরও বলেন, ১ লিটার টক দই বিক্রি হয় ৮০ টাকায় আর দই তৈরির প্রধান কাঁচামাল দুধের প্রতি লিটার এখন ৭০ টাকা। এর মধ্যে আরো কিছু খরচ যোগ করলে আমাদের আর কোন লাভ থাকে না। তাই আমাদের নতুন প্রজন্ম এখন পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছে।
এদিকে ভোজন রসিক গ্রামের অনেক মানুষ টক দইয়ের চাহিদা অনুভব করে। আশরাফ আলীর কাছ থেকে টক দই কিনতে আসা, গাইবান্ধা সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের আরিফ খা গ্রামের নাসির উদ্দিন বলেন, টক দই অনেক সুস্বাদু একটি খাবার। আমরা ছোট থেকেই এই খাবার খেয়ে আসছি। এখন আর আগের মতো গোয়ালারা টক দই বিক্রি করতে আসে না। আগে যেখানে কয়েক দিন পর পর আসত এখন সেখানে দুই তিন মাসেও তাদের দেখা মিলে না তাই দেখা পেলেই টক দই কিনি। স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, চিকিৎসা বিজ্ঞানেও দুধের পাশাপাশি টক দইয়ের উপকারিতা রয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে একজন সুস্থ মানুষের প্রতিদিন ২০০-২৫০ গ্রাম টক দই গ্রহণ করা উচিত। এতে আছে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি, যা হাড় ও দাঁতের গঠনে সহায়ক। নারীদের টক দই বেশি প্রয়োজন। নারীদেহে ক্যালসিয়ামের অভাবে থাকে বেশি। গাইবান্ধা এস কে এস হাসপাতালের পুষ্টি ও ডায়েটিশিয়ান বিশেষজ্ঞ মাহফুজা আক্তার মুন্নী বলেন, টক দইয়ে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও ফ্যাট আছে। এছাড়াও ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়াম থাকায় টক দই থেকে দুধের সমপরিমাণ পুষ্টি পাওয়া যায়।টক দইয়ের ব্যাকটেরিয়া অত্যন্ত উপকারী, এটা শরীরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলে এবং উপকারী ব্যাকটেরিয়া বাড়িয়ে হজম শক্তি বৃদ্ধি করে।
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com