আনোয়ার হোসেন: | শুক্রবার, ১১ অক্টোবর ২০২৪ | প্রিন্ট | ৭৯ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
দেশের উত্তর জনপদের জেলা গাইবান্ধা। রংপুর বিভাগে এই জেলার অবস্থান। অন্যতম বৃহৎ নদী, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র-যুমনাসহ আরও কয়েকটি ছোট নদী প্রবাহিত হয়েছে এই জেলার ওপর দিয়ে। ভৌগোলিকভাবে মোট আয়তনের প্রায় ৩৪ শতাংশ এলাকাই নদী ও চরাঞ্চল। জেলার মোট জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশ মানুষ নদী চরাঞ্চলের বসবাস করে। এ জেলার ১০০ জনের মধ্যে ৪৮ জনই দারিদ্রতা নিয়ে বসবাস করছে। দেশের শীর্ষ ১০ দরিদ্রতম জেলার তালিকায় গাইবান্ধা নাম রয়েছে। তবে, দারিদ্রতার বৃত্ত থেকে উত্তরণ ও টেকসই সার্বিক উন্নয়নে জেলার নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ৭টি মূল কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। ১. বন্যা ও নদীভাঙন ২. ভারী কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠা ৩. বেকার সমস্যা ও দক্ষ জনশক্তির অভাব ৪. অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ৫. উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (ইউনিভার্সিটি- কারিগরি প্রতিষ্ঠান) গড়ে না ওঠা ৬. জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব ৭. কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার ও সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনার অভাব ৮. তথ্য ও প্রযুক্তি সেবা ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার ঘাটতি।
১. জেলার সাঘাটা, ফুলছড়ি সদর ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ২২টি ইউনিয়ন নদী ও চরাঞ্চল বেষ্টিত। এই চার উপজেলার নদী ও চরের ১৬৫টি চর-গ্রামে প্রায় চার লাখ মানুষ বসবাস করে।কিন্তু নদীর ক্রমাগত ভাঙনে চরের মানুষ বছরের চারবার পর্যন্ত বসতবাড়ি সরাতে হচ্ছে। নদীগুলো ক্রমাগত নাব্যতা হারিয়ে ফেলছে। এতে করে প্রতি বছর বন্যা ও নদীভাঙনের তীব্রতা বেড়েই চলছে।
একটি বেসরকারি জরিপে গত দুই দশকে নদীভাঙনে তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র যমুনা চরের লক্ষাধিক মানুষ এলাকা ছেড়ে বিভিন্ন জেলায় আশ্রয় নিয়েছে। বর্তমানে নদীর দু’পাড়ে ভাঙন ঠেকাতে স্থায়ী পদক্ষেপ নেয়া হলেও চর রক্ষায় কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। এতে করে চরের বসতি, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও কৃষিজমি নদীতে বিলীন হচ্ছে। চরগুলোকে নদীভাঙনের কবল থেকে রক্ষায় স্থায়ী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে জানান, ফুলছড়ি উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবু সাঈদ। তিনি বলেন, চরের মানুষজন চরে থেকেই বসবাস করতে চায়, কিন্তু বন্যা ও নদীভাঙন তা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রতি বছর চরের আবাদী জমি ও বসতবাড়ি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এতে করে বাড়িঘর স্থানান্তরে অর্থ খরচ হয়। এ কারণে দারিদ্রতার কবল থেকে বের হতে পারে না চরের মানুষজন। তিনি বলেন, পরিকল্পনা করে স্থায়ী চরগুলোকে নদীভাঙনের কবল থেকে রক্ষা করতে হবে।
২. গাইবান্ধায় কোনো ধরনের ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, অর্থনৈতিক অঞ্চল অথবা ইপিজেড গড়ে ওঠেনি। এতে করে জেলার ৭০ শতাংশ শ্রমজীবী এলাকা ছেড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে কাজের সন্ধান করে। কিন্তু বারো মাস কাজের সুযোগ না থাকায় বছরে অর্ধেক সময় বাড়িতে বেকার হয়ে থাকতে হয়। এতে ধারদেনা করে সংসারের ব্যয়ভার চলাতে হয়। বিসিক গাইবান্ধা জেলার উপমহাব্যবস্থাপক রবিন চন্দ্র রায় জানান, গাইবান্ধায় স্থানীয় উদ্যোক্তার অভাবে অনেক প্লট এখনও ফাঁকা রয়েছে। তবে, গ্রামে গ্রামে ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে। এতে করে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে গাইবান্ধা নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অ্যাড, সিরাজুল ইসলাম বাবু বলেন, গাইবান্ধায় মানুষের
দীর্ঘদিনের দাবি ইপিজেড স্থাপনের। কিন্তু জমি নিয়ে জটিলতায় সেটিও হচ্ছে না।
৩. বেকার সমস্যা ও জনশক্তির অভাবে এজেলার মানুষ কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে। আবার অদক্ষতা নিয়ে কাজে যুক্ত হয়ে স্বল্প মজুরিতে কাজ করতে হচ্ছে। এজন্য কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব রয়েছে বলে জানান বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণউন্নয়ন কেন্দ্রের (জিইউকে) নির্বাহী এম আবদুস সালাম। তিনি বলেন, বেকার যুব নারী পুরুষদের নানা ট্রেডে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। কয়েকটি এনজিও সরকারিভাবে কিছু উদ্যোগ নিলেও তা পর্যাপ্ত না উল্লেখ করে বলেন, দক্ষতা থাকলে কখনও সে বেকার থাকবে না। দেশে দক্ষ জনশক্তির অনেক ঘাটতির তথ্য তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, পরিবারের যদি দক্ষ মানুষ থাকে তাহলে সেই পরিবারে দারিদ্রতা থাকবে না
৪. যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি পকেট জেলা হিসেবে পরিচিত গাইবান্ধা। ইতোমধ্যে উপজেলার
সঙ্গে উপজেলা শহরের যোগাযোগ কিছুটা উন্নত হলেও নৌপথে ও ঢাকার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে তেমন উন্নয়ন হয়নি। চরাঞ্চলের মানুষের মেইনল্যান্ডের সঙ্গে বর্ষাকালীন নৌকার মাধ্যমে যোগাযোগ করলেও বছরের বেশির ভাগ সময় নদীতে পানি না থাকায় চরম দুর্ভোগ নিয়ে পড়ালেখা, চিকিৎসাসেবা, কৃষিপণ্য ক্রয় বিক্রয়ে হাট বাজারে চলাচল করেতে হয়।
এদিকে, গাইবান্ধার বালাসীঘাট থেকে জামালপুর জেলার দেয়ানগঞ্জে হয়ে ময়মনসিংহ, গাজীপুর, ঢাকাসহ সারাদেশের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগে ব্রহ্মপুত্র নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। গাইবান্ধা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মকছুদার রহমান শাহান জানান, ব্রহ্মপুত্র নদে টানেল কিংবা সেতু নির্মাণ হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে গাইবান্ধার উন্নয়ন হবে এবং এতে জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে।
৫. গাইবান্ধা উচ্চতর শিক্ষার জন্য গড়ে ওঠেনি বিশ্ববিদ্যালয়। এতে জেলার দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা অন্যত্র গিয়ে উচ্চতর পড়ালেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আবার মেডিকেল কলেজ না থাকায় চিকিৎসা ক্ষেত্রে পড়তে হচ্ছে চরম বিড়ম্বনায়। এতে জীবন ও অর্থের ক্ষতিও পুষতে হচ্ছে। বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. এ বি এম আবু হানিফ জানান, গাইবান্ধা একটি অনুন্নত জেলা। বেশির ভাগ মানুষ দারিদ্রতা নিয়ে বসবাস করে। পেটের ভাত জোগাতে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর ও বগুড়ায় গিয়ে চিকিৎসা ব্যয় বহন করা কঠিন। এ কারণে তিনি গাইবান্ধায় একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন। এছাড়া কৃষি প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট এ পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে সেখানেও কৃষি বিদ্যালয় স্থাপন করা যেতে পারে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক জহুরুল কাইয়ুম।
৬. জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাবে জীবনযাত্রায় মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এই অঞ্চলের জনজীবনে। কেননা, বন্যা, খরা, নদীভাঙন, তাপদহ, শৈত্যপ্রবাহ এসব দুর্যোগে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশে মারাত্মক বাধা হয়ে পড়েছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও গণউন্নয়ন কেন্দ্রের (জিইউকে) নির্বাহী প্রধান এম আবদুস সালাম বলেন, জলবায়ুর প্রভাবে ক্ষতি পুষতে হচ্ছে এই অঞ্চলের মানুষকে। এজন্য তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সরকারি-বেসরকারি সহায়তা প্রদানের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা ও তহবিল বৃদ্ধির জন্য দাবি করেন। এছাড়া তিনি বলেন, চরের উন্নয়নে চর উন্নয়ন বোর্ড গঠন করে চরের সমস্যা, সম্ভাবনা বের করে কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করলে জেলার টেকসই উন্নয়ন সম্ভব বলে অভিমত ব্যক্ত করেন।
৭. গাইবান্ধায় ধান, মরিচ, ভুট্টা, বেগুন, আলুসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদিত হলেও সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে ক্ষতিতে পড়তে হয় চাষিদের। জেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে ব্যাপক পরিমাণে ভুট্টা ও মরিচ উৎপাদন হয়। তবে এগুলো সংরক্ষণের কোনো সুযোগ নেই। এ কারণে যে সময়ে এসব কৃষিপণ্য ঘরে ওঠে তখন বাজার মূল্য না থাকায় বেশ লোকসানে বিক্রি করতে হয়। আবার যোগাযোগ সুবিধা না থাকায় পরিবহনে ব্যয় বর্তায় চাষিদের ওপর। কৃষিবিদ মোজাম্মেল হোসেন বলেন, কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এছাড়া জলবায়ুসহিষ্ণু কৃষি চাষাবাদে সহায়তা করতে হবে।
৮. তথ্য ও প্রযুক্তি সেবায় গাইবান্ধা জেলার মানুষ বেশ পিছিয়ে। মোট জনসংখ্যা প্রায় ৫২ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। এর মধ্যে ২১ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। আবার মোট পরিবারের ৪ শতাংশ বাড়িতে এখনও বিদ্যুৎ সুবিধা নেই। যার কারণে তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে তাপ বিদ্যুৎ অথবা সৌরবিদ্যুৎ সুবিধা সবার ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। তথ্য ও প্রযুক্তিবিদ রেজাউল করিম জেমস বলেন, দেশের সার্বিক উন্নয়নে তথ্য ও প্রযুক্তির প্রসার করতে হবে। এজন্য দরিদ্র মানুষকে প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে সরকারের উদ্যোগ নিতে হবে।
উল্লেখ্য, ৭টি থানা, ৪টি পৌরসভা ও ৮১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত গাইবান্ধা জেলায় মোট জনসংখ্যা ২৫ লাখ ৬২ হাজার ২৩৩ জন। এর মধ্যে নারী ১৩ লাখ ২০ হাজার ৯৬২ জন এবং পুরুষ ১২ লাখ ৪১ হাজার ১১৩ জন। হিজরা রয়েছে ১৫৩ জন এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জনসংখ্যা ৪ হাজার ১৫০ জন। মোট খানা বা পরিবারের সংখ্যা ৭ লাখ ২৮৮টি। গাইবান্ধাবাসীর দাবি, চর উন্নয়ন বোর্ড গঠনের মাধ্যমে গাইবান্ধাসহ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর উন্নয়নে সরকার টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com