শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

“ছকু মিয়ার লাশ টানা জীবন : সংসারে হাহাকার”

আনোয়ার হোসেন, নিজস্ব প্রতিবেদকঃ   |   সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ২৫ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

“ছকু মিয়ার লাশ টানা জীবন : সংসারে হাহাকার”
৩৭

 

ঝড়-বৃষ্টি-কাদা, রাত-দিন যাই হোক, ডাক পেলেই লাশ নিয়ে ছুটে চলতে হয় থানায়, মর্গে বা নিহতের বাড়িতে। সাধারণত অস্বাভাবিক মৃত্যু, হত্যা, দুর্ঘটনা হলেই ডাক পড়ে ছকু মিয়ার। সৎভাবে অর্থ উপার্জন করলে সমাজে কোন পেশাই ছোট নয়।

জীবনে বেঁচে থাকার জন্য চাই অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান। চাই শিক্ষা, চিকিৎসার অধিকার। আর এর জন্যই মানুষ জীবনের সাথে সংগ্রাম করে। এই জীবন সংগ্রামের চক্রে নিরন্তর ঘুরপাক খাওয়া ছকু মিয়া বেছে নিয়েছেন লাশ টানার এক বিচিত্র পেশা। আয়ের একমাত্র অবলম্বন ভ্যান নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে চলা।

তারপর লাশ নিয়ে পৌঁছান গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতাল মর্গে। আবার ডোমের কাটাছেঁডা লাশ নিয়ে পাড়িও জমান নিহতের আত্মীয়-স্বজনের কাছে। এভাবেই শতশত লাশ নিয়ে এপার-ওপার করেছেন তিনি।

গাইবান্ধা শহর থেকে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে বল্লমঝাড় ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রাম। এই গ্রামের রাস্তার পাশে টিনের দোচালা ঘর ছকু মিয়ার।

পিতার একমাত্র ছেলে সে। সংসারে অভাবের তাড়নায় ছোটো বেলায় স্কুলে যাওয়ার ভাগ্য হয়নি। বয়স যখন ১৪/১৫ তখন বিয়ে করেন রেখা নামের এক নারীকে। তারপর অভাব আরও জেকে বসে তার উপর। অভাবের তাড়নায় খুঁজতে থাকেন কাজ।

একসময় ছকু মিয়ার ছিল ছোটখাটো ব্যবসা। অভাবের তাড়নায় সেই ব্যবসাও টিকিয়ে রাখতে পারেননি। সংসারের হাল ধরতে গিয়ে পরিচয় হয় থানা পুলিশের সাথে।

তারপর থেকেই হাসপাতালের মর্গে লাশ বহনের কাজ বেছে নেন। শুরুতে মৃতদেহ দেখে গা শিউরে উঠলেও, এখন সেটিই তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।

লাশ বাহক ছকু মিয়া জানান, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে লাশ টানার কাজ করা নিয়ে তার হয়েছে বিচিত্র অভিজ্ঞতা আর অনুভূতি। লাশ যত গলিতই হোক না কেন তার কাছে তা আমানত। প্রথম প্রথম লাশ টানতে ভয় লাগতো। একটু নির্জন স্থানে কিংবা আঁধার নামলে গা ছমছম করতো। এখন আর এমনটি হয় না। লাশের প্রতি ছকু মিয়ার খুব মমতা। লাশ টানতে গিয়ে তার চোখে জল এসে যায়। কোন কোন সময় লাশের পাশে বসেই তাকে রাত কাটতে হয়।

ক্ষুধা লাগলে সেখানেই বসে খেতে হয়। পঁচা, দুর্গন্ধযুক্ত লাশ থানার বাইরে নিয়ে অনেক সময় সারারাত বসে থাকতে হয়। এমন কষ্টের পর যে পারিশ্রমিক পান তা দিয়ে চলে তার জীবন সংগ্রাম।

সংসারে দুঃখ কষ্ট থাকলেও ভয় স্পর্শ করতে পারেনি বিচিত্র পেশার এ মানুষটিকে। লাশ টানা বাপ-দাদার পেশা না হলেও ছকু মিয়া বেছে নিয়েছেন লাশ টানার এই বিচিত্র পেশা। লাশ টানার কাজ না থাকলে তাকে হয়ত বসেই থাকতে হতো।

ছকু মিয়ার স্ত্রী রেখা বেগম বলেন, কোথাও পঁচা লাশ পড়ে আছে-খবর পেলেই পুলিশ আগে বাড়িতে আসত।এখন ফোনে কথা হয় তার সাথে। তারপর ভ্যান নিয়ে ছকু মিয়া হাজির হন লাশের পাশে।

তিনি দুঃখ করে বলেন, ছকু মিয়া অনেক লাশ টেনে টাকা পাননি। অনেকে কম দেন। আবার বেওয়ারিশ লাশ ফ্রিও টানতে হয় তাকে। তবুও লাশের খবর পেলে সবকিছু ভুলে ছুটে যান তিনি।

এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা রহিম উদ্দিন বলেন, ছকু মিয়া একজন ভালো মনের মানুষ। সে একটা কঠিন কাজ করে। সমাজ তাকে অবজ্ঞার চোখে দেখেনা। সে তো আর অপরাধ করছে না, মানুষের সেবা করছে।
প্রতিবেশীদের নানা উপকারে তিনি কাজ করেন। লাশ টানতে গিয়ে কারো মনে কখনো কষ্ট দিতে দেখিনি তাকে। তিনি অত্যন্ত ভালো মনের মানুষ।

ঝড়, বৃষ্টি ও রোদের মধ্যেও তাকে লাশ টানতে দেখা যায়। লাশ টানা ছকু মিয়ার পেশা হলেও এলাকার মানুষ তাকে ভালোবাসে শ্রোদ্ধার চোখে দেখেন।

ছকু মিয়া বলেন, মরা মানুষের লাশের খুব গন্ধ হয়। তারপরেও বাধ্য হয়েই মরা পঁচা, গলিত, গলায় ফাঁস লাগানো, কবর থেকে গন্ধযুক্ত লাশ তোলার কাজ করতে হয়। এক সময়ে মরা, পঁচা, গলা, ঝুলন্ত মানুষের লাশ দেখে খুব ভয় হতো।

কিন্তু এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, জানি না কতদিন এই ভারী লাশ বহন করে চলতে পারব। সরকার যদি একটা স্থায়ী ব্যবস্থা করে দিত, তবে বাকি জীবনটা হয়তো একটু শান্তিতে কাটাতে পারতাম।

ছকু মিয়ার গল্প কেবল একজন লাশের বাহকের গল্প নয়, এটি বেঁচে থাকার লড়াইয়ের এক করুণ আখ্যান। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটি কি পারবেন একটু সম্মানের সঙ্গে বাঁচার নিশ্চয়তা পেতে? নাকি মৃত্যুর মিছিলে ছকু মিয়ার নামটাও হারিয়ে যাবে অগোচরে?

গাইবান্ধার সচেতন মহলের দাবি, ছকু মিয়ার মতো যারা সমাজের এমন অপরিহার্য অথচ অবহেলিত কাজ করছেন, তাদের প্রতি মানবিক দৃষ্টি দেওয়া সরকারের দায়িত্ব।

এ প্রসঙ্গে গাইবান্ধা সদর থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, লাশ টানার কাজ কেউ করতে চায়না।
ভয়ে মরা মানুষের থেকে দুরে দাড়িয়ে দেখতে থাকে মানুষ। আমি মনে করি উনি একটি মহৎ কাজের সাথে জড়িত।

ফাঁসির বিভৎস লাশ থেকে শুরু করে, পড়ে থাকা পঁচা গলা মরদেহ তিনি ভ্যানে বহন করেন। এমন সাহস কার আছে? আর এ কাজও কেউ করতে চায়না। সে কারনে ছকু মিয়ার পাওনা আরও অনেক বেশি হওয়া উচিত।

মৃতদেহ নিয়ে নানান কুসংস্কার আর অজানা ভয় ছকু মিয়াকে স্পর্শ করতে পারেনি। তবে দারিদ্রের নিষ্ঠুর দলন-পেষণে মাঝে মধ্যে তাকে স্ত্রী-সন্তান সংসার নিয়ে ভীত করে তোলে। সরকারের মানবিক দৃষ্টি পেলে সমাজের জন্য অত্যন্ত জরুরী এ পেশার মানুষটি কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারতেন।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us

ফলো করুন bangladoinik.com-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
ফখরুল ইসলাম
সহসম্পাদক
মো: মাজহারুল ইসলাম
Address

জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com