| শুক্রবার, ১৮ জুলাই ২০২৫ | প্রিন্ট | ২৬৬ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
গত জুলাইয়ে আমরা ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাড়িয়ে ছিলাম। চোখের সামনে দেখেছিলাম এক সাহসী গণ অভ্যুত্থানের ও সৈরতন্ত্রের পতন। আর তার পথ বেয়ে ফিরে এসেছিলো বহু কাঙ্ক্ষিত বাক-স্বাধীনতা। জুলাই এসেছে আবার। কিন্তু সাথে করে নিয়ে এসেছে কিছু প্রশ্ন, কিছু রক্ত, কিছু কান্না। একদিকে চাঁদা না দেওয়ার অপরাধে খুন হচ্ছেন ব্যবসায়ী। অন্যদিকে উচ্চাকাঙ্খী মেয়ে মা-বাবার বিরুদ্ধে দাড় করাচ্ছে মামলা, যেন রক্তের সম্পর্ককেও অস্বীকার করা এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আরেকদিকে খুতবার বিষয় পছন্দ না হওয়ায় মসজিদের ভিতরই চাপাতির কোপে প্রাণ হারাচ্ছেন হুজুর। এসব কী নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি বৃহৎ সামাজিক বিপর্যয়ের চিত্র?
৭১ এ যেটা সংঘটিত হয়েছিলো সেটা ছিলো বহিঃশত্রুর সর্বগ্রাসী ধ্বংসযজ্ঞ, ধর্ষণ, শিশু হত্যা, গণহত্যা ও বিভীষিকময় নিষ্ঠুরতার চূড়ান্ত রুপ।
তখন চিহ্নিত পোষাকে শত্রু ছিল স্পষ্ট। লাখো শহিদ ও মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিলো লাল সবুজের মানচিত্র।
এরপর স্বাধীন দেশে স্বৈরশাসনের উচ্ছেদের জন্য সংঘটিত হয়েছিলো ৯০-এর গণ-আন্দোলন সেখানে শৈরতন্ত্রের পতন এবং গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন ঘটেছিলো।
এরপর ১/১১ এর এক ধূসর অধ্যায়, যেখানে গণতন্ত্রের নামে গণতন্ত্রই স্থগিত হয়েছিল, সংস্কার এর মোড়কে নাগরিক স্বাধীনতা গুম হয়ে গিয়েছিল।
এরপর টানা ১৭ বছর আমরা দেখেছি একচ্ছত্র শাসনব্যবস্থা, যেখানে গণতন্ত্র ছিল কেবল কাগজে-কলমে। জনগণের বাক-স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার সবই ছিলো অবরুদ্ধ।
ভোটের নামে হয়েছে ডামি নির্বাচন, যেখানে জনগণ নয়, নিতীনির্ধারক ছিল রাজনৈতিক ও প্রসাশনিক আমলাবৃন্দ। বিরোধিতা মানে দেশদ্রোহিতা এই ন্যারেটিভে গলা টিপে ধরা হয়েছিলো ভিন্নমতকে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মোড়কে সংবিধানবিরোধী কর্মকাণ্ডকে রাষ্ট্রীয় বৈধতা দেওয়া হয়েছিলো ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে। স্বাধীনতা ছিল, কাগজে কলমে, বাস্তবে রাষ্ট্র হয়ে উঠেছিলো একদল অভিজাতের সম্পত্তি, আর জনগণ ছিলো করদাতা এক নীরব শোষিত শ্রেণি।
এরপরই এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা নিয়ে এসেছিলো ২০২৪ এর জুলাই আন্দোলন, যা
প্রথমে ছিল কোটা সংস্কার, বৈষম্যের বিরুদ্ধে এবং ন্যায্যতার পক্ষে। কিন্তু ধীরে ধীরে তা রূপ নেয় গণআন্দোলনে, যেখানে কেবল ছাত্র নয় যোগ দেয় শিক্ষক, চাকরিপ্রার্থী, শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক পর্যন্ত।
সম্মিলিত এ কণ্ঠস্বর এক পর্যায়ে পরিণত হয় গণঅভ্যুত্থানে যার ঢেউ এসে ভেঙে দেয় দেড় যুগের বেশি সময় ধরে চলা একচ্ছত্র একনায়কতান্ত্রিক শাসনের প্রাচীর।
এই অভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘ শ্বাসরুদ্ধকর রাজনৈতিক শোষনের বিরুদ্ধে এক দমকা বাতাস। যার ফলে
দেড় যুগের স্তব্ধ বাক-স্বাধীনতা ফিরে এসেছিল রাজপথে, মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়েছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্লোগান, স্বৈরশাসনের যে প্রাচীর ভাঙা অসাধ্য মনে হতো, তা ভেঙে গিয়েছিল জনতার সম্মিলিত শক্তিতে।
কিন্তু ঐতিহাসিক প্রত্যবর্তনের বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ২০২৫ এর জুলাই এ এসে আমরা যেন দাড়িয়ে আছি বিভ্রান্তির, হতাশার আর অবক্ষয়ের এক ভয়াবহ মোড়ে।
স্বৈরতন্ত্রের পতন ঘটলেও, স্বৈরচিন্তার ছায়া কি এখনও থেকে গেছে? নাকি তা আরও গভীরভাবে ঢুকে পড়েছে সমাজের শিরায়-উপশিরায়? তাহলে কি রাষ্ট্রযন্ত্র শুধু প্রভু বদলেছে কিন্তুু স্বভাবে অবয়ব থেকে গেছে?
আজ ২০২৪ কিংবা ২০২৫ এ এসে আমরা নতুন রূপে সেই পুরোনো নিপীড়নেরই পুনরাবৃত্তি দেখতে পাচ্ছি। স্বৈরতন্ত্র এখন আর চিহ্নিত পোষাকে নয়, বরং বাসা বেধেছে চিন্তায়, ব্যবস্থায়, নীতিতে এবং আমাদের দৈনন্দিন পদচারনায়। এখন আর যুদ্ধ একযোগে নয় বরং, প্রতিদিন নিঃশব্দে সংঘটিত হচ্ছে, ক্ষয়ে যাচ্ছে তিলে তিলে জাতীসত্তার, বিশ্বাস, স্বাধীনতা, মানবতা আর আত্মপরিচয়।
এ যেন এক অভ্যন্তরীণ রক্তপাত যা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু ভিতরে ভিতরে জাতির হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করে চলেছে।
এই অবস্থায় মুক্তির পথ খুজে পেতে হলে, আবারও প্রয়োজন সত্যের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়া, এবং সাহস নিয়ে দাড়িয়ে যাওয়া।
২৫ এর জুলাইএ আমরা স্মরণ করতে চেয়েছিলাম একতার, বীরত্বের কিংবা শোকের কোনো ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কিন্তু আবারও শুরু হলো নতুন তাণ্ডব ও নতুন হিংসার ট্রাজেডি।
আবারও জুলাই, আবারও বাংলাদেশ এই বাক্যটি যেন কষ্টে গেথে গেলো জাতীর বুকে। এক বাংলাদেশ কতবার স্বাধীন হবে?
প্রতিটি হত্যাকাণ্ড, প্রতিটি ধর্ষণ, প্রতিটি বিশ্বাসভঙ্গ যেন আমাদের মূল্যবোধকে একবার করে বিদ্ধ করছে। একেকটি জুলাইয়ে আমরা হারাচ্ছি আরও কিছুটা স্বাধীনতা, আরও কিছুটা সহমর্মিতা, আর আরও একটু মানুষ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা। প্রশ্ন জাগে যেখানে একসময় এক ঝটকায় শত্রুকে হটানো গিয়েছিল, সেখানে আজ কেন আমরা প্রতিদিন অদৃশ্য এক শত্রুর হাতে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছি?
আজ আমাদের সমাজে বেড়ে উঠছে আত্মকেন্দ্রিকতা, সহিংসতা এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়। পারিবারিক বন্ধন ভেঙে যাচ্ছে অর্থ আর উচ্চাকাঙ্খার দাপটে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সম্মান রক্ষা পাচ্ছে না নিজেদের মধ্যেই। আইন, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক জবাবদিহিতার অভাব যেন এ দুর্দশাকে আরও গভীর করে তুলেছে।
প্রশ্ন জাগে এ জাতী কি এভাবেই বাচবে?
রাষ্ট্র কি বারবার আশা যুগিয়ে নিরাশ করবে?
বারবার ক্ষমতাসীনদের উদাসিনতায় পিষ্ট হয়ে আন্দোলন করতে হবে?
এর শেষ কোথায়??
খালিদ হাসান
উন্নয়ন, মানবাধিকার কর্মি
ও তৃনমুল রাজনীতি বিশ্লেষক।
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com