মোঃ মাজহারুল ইসলাম | শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | ৬৫ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি প্রতিদিনের শোক, পঙ্গত্ব, অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আরেক নাম। আমরা যখন নিরাপদ সড়কের কথা বলি, তখন অধিকাংশ সময় আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকে আইন প্রয়োগ, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, লাইসেন্স বা অবকাঠামোগত উন্নয়নে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায় মানুষের মনস্তত্ত্ব ও মানবিকতা।
একজন চালক শুধু স্টিয়ারিং ধরে রাখা ব্যক্তি নন; তিনি বহু জীবনের নিরাপত্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিভাবক। একটি দূরপাল্লার বাসে ৪০-৫০ জন যাত্রী থাকেন। প্রতিটি যাত্রীর পেছনে আছে একটি পরিবার, স্বপ্ন ও দায়িত্ব। সেই জীবনগুলো নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া এটি কেবল পেশা নয়, একটি নৈতিক অঙ্গীকার। চালকের মধ্যে যদি দায়িত্ববোধ, সহানুভূতি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ না থাকে, তবে কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতা যথেষ্ট নয়। গাড়ি চালানো একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া রাগ নিয়ন্ত্রণ, ক্লান্তি ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি মূল্যায়ন, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সবই মানসিক সুস্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
দূরপাল্লার বাসগুলোতে একটি ছোট উদ্যোগ বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বাস ছাড়ার আগে চালক যদি, যাত্রীদের সালাম বা শুভেচ্ছা জানান, নিজের পরিচয় দেন, নিরাপদ যাত্রার অঙ্গীকার করেন, যাত্রীদের দোয়া বা সহযোগিতা চান, যাত্রাপথের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা শেয়ার করেন। তাহলে চালক ও যাত্রীর মধ্যে একটি পারস্পরিক আস্থা তৈরি হয়। এতে যাত্রীরা চালকের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকেন, অযথা তাড়াহুড়ো বা চাপ প্রয়োগ করেন না। একই সঙ্গে চালকের মধ্যেও দায়িত্বের অনুভূতি আরও সুদৃঢ় হয়। নিরাপদ সড়ক কেবল চালকের একার দায়িত্ব নয়। যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে, নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া বাস থামানোর অনুরোধ না করা, চলন্ত বাসে ওঠানামা না করা, চালককে অপ্রয়োজনীয়ভাবে তাড়াহুড়া করতে চাপ না দেওয়া, ট্রাফিক আইন মানতে সহযোগিতা করা।
একজন দায়িত্বশীল যাত্রী নিরাপদ সড়কের সহযোদ্ধা। প্রশিক্ষণে মানসিকতা ও পেশাদায়িত্ব তৈরি করতে হবে। বর্তমানে অধিকাংশ প্রশিক্ষণ টেকনিক্যাল দক্ষতার ওপর কেন্দ্রীভূত। কিন্তু সময় এসেছে প্রশিক্ষণ কাঠামোয় মনস্তাত্ত্বিক সক্ষমতা, রাগ নিয়ন্ত্রণ, নৈতিক দায়িত্ববোধ, মানবিক আচরণ ও পেশাগত সততা এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার। নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান, ১. ড্রাইভার প্রশিক্ষণে বাধ্যতামূলক “মানসিক স্বাস্থ্য ও আচরণগত দক্ষতা” মডিউল যুক্ত করা। ২. দীর্ঘ যাত্রার আগে সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংকে নীতিগতভাবে উৎসাহিত করা। ৩. নিয়মিত কাউন্সেলিং ও রিফ্রেশার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। ৪. যাত্রী সচেতনতা ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা।
মানবিক নীতিই টেকসই সমাধান করা করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে। আইন প্রয়োগ প্রয়োজন, অবকাঠামো উন্নয়নও জরুরি। কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদান হলো মানুষের বিবেক। আমরা যদি চালক, যাত্রী ও পথচারী সবার মধ্যে দায়িত্বশীল ও মানবিক মনোভাব গড়ে তুলতে পারি, তবে নিরাপদ সড়ক কেবল শ্লোগান হবে না; বাস্তবতায় রূপ নেবে। স্টিয়ারিংয়ের পেছনে বসা মানুষটি যদি নিজেকে কেবল চালক নয়, বরং বহু জীবনের রক্ষক হিসেবে ভাবেন, তবে দুর্ঘটনার গ্রাফ স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে। নিরাপদ সড়ক গড়তে হলে প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন মনস্তাত্ত্বিক সুস্থতা, নৈতিকতা ও পারস্পরিক সম্মান। কারণ শেষ পর্যন্ত সড়কে গাড়ি নয়, মানুষই মানুষকে নিরাপদ রাখে।
মোঃ মাজহারুল ইসলাম
কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য পেশাজীবী ও সমাজকর্মী
প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক, নিরাপদ সড়ক চাই-নিসচা
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com