নিজস্ব প্রতিবেদক | মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | ৯০ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
বেশ অনেক দিন আগে মিডিয়াকে কেন্দ্র করে পর্ব আকারে বিভিন্ন পত্রিকায় আমার লেখা উপ-সম্পদকীয় প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সকল কলামগুলোর মধ্য টক শো নিয়েও একটি কলাম লিখেছিলাম। তখন অনেকেই সেই বিষয়টি পজিটিভভাবে নিয়ে ছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন টেলিভিশনে প্রচারিত টক শো তে উপস্থাপনার ধরণ দেখে আবার লিখতে বাধ্য হলাম।
একটি প্রশ্ন করেই কলাম লেখাটি শুরু করতে চাই, আমরা মিডিয়াকর্মীরা কি সত্যি মিডিয়াকে ভালোবাসি? বা মিডিয়াকে নিরপেক্ষ রাখতে চাই? না, নিজের স্বার্থে এই মিডিয়াকে ব্যবহারের হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করতে চাই? আসুন, মূল পর্বে যাই। টেলিভিশনের টক শো আজ আর কেবল মতবিনিময়ের জায়গা নয়; অনেক ক্ষেত্রে তা পরিণত হচ্ছে পক্ষ নেওয়ার মঞ্চে।
এই সংকটের কেন্দ্রে আলোচকরা নয়। কারণ, আলোচকরা মত দেবেন, যুক্তি তুলে ধরবেন, এমনকি পক্ষ নিবেন, তাই স্বাভাবিক। প্রকৃত সংকট তৈরি হয় তখনই, যখন উপস্থাপক প্রশ্নের আড়ালে, মন্তব্যের ভঙ্গিতে কিংবা আলোচনার নিয়ন্ত্রণে নিজের পক্ষপাত স্পষ্ট করে তোলেন। একটি টক শোর সাফল্য নির্ভর করে উপস্থাপকের নিরপেক্ষতার ওপর। তার দায়িত্ব হলো আলোচনাকে সুশৃঙ্খল রাখা, বিষয়কেন্দ্রিক রাখা এবং সব পক্ষকে সমানভাবে কথা বলার সুযোগ দেওয়া। অথচ ইদানীং দেখা যাচ্ছে, অনেক টক শো তেই প্রশ্ন এমনভাবে উপস্থাপিত হয়, যা উত্তর জানার জন্য নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে সুবিধা দেওয়া বা বিপাকে ফেলার উদ্দেশ্যে। কখনো আবার উপস্থাপক নিজেই বক্তব্য দিতে শুরু করেন। আলোচকরা তখন পরিণত হন কেবল সহমত প্রদর্শনের ভূমিকায়।
এর ফলে টক শো তার মৌলিক চরিত্র হারায়। যুক্তির জায়গায় আসে নাটকীয়তা, বিশ্লেষণের জায়গায় উত্তেজনা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো সাধারণ দর্শক বিষয়টি সহজেই বুঝে ফেলেন। তারা স্পষ্ট দেখতে পান কোন প্রশ্ন নিরপেক্ষ, আর কোন প্রশ্ন আগে থেকেই অবস্থান নির্ধারিত করে ছোড়া। নিঃসন্দেহে উপস্থাপকও মানুষ। একজন নাগরিক হিসেবে তার রাজনৈতিক মতাদর্শ, বিশ্বাস কিংবা দৃষ্টিভঙ্গি থাকতেই পারে। কিন্তু পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সেই ব্যক্তিগত অবস্থানকে নীরব রাখা অপরিহার্য। যেমন একজন বিচারক ব্যক্তিগত মত নিয়ে রায় দেন না, তেমনি একজন উপস্থাপকও ব্যক্তিগত আদর্শ নিয়ে টক শো পরিচালনা করতে পারেন না। এখানেই পেশাদারিত্বের প্রকৃত মানদ-। উপস্থাপক যখন পক্ষ হয়ে যান, তখন আলোচক ও সঞ্চালকের মধ্যকার সীমারেখা মুঁছে যায়। টক শো তখন আর জনগণের প্রশ্নের জায়গা থাকে না; তা হয়ে ওঠে মতাদর্শিক প্রচারণার একটি মাধ্যম। এর ক্ষতি শুধু একটি অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো গণমাধ্যমের প্রতি জনগণের আস্থা।
গণতন্ত্র টিকে থাকে প্রশ্নে, আর সেই প্রশ্নের ন্যায্যতা নিশ্চিত করে নিরপেক্ষ গণমাধ্যম। উপস্থাপক যখন পক্ষপাতের পথে হাঁটেন, তখন তিনি শুধু একটি ‘টক শো র ভারসাম্য নষ্ট করেন না, তিনি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিসরকেই সংকুচিত করেন। কারণ, পক্ষপাতী প্রশ্ন নাগরিককে বিভ্রান্ত করে, মত গঠনের স্বাধীনতাকে দুর্বল করে এবং রাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে একমুখী চিন্তার দিকে ঠেলে দেয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য এটি নিঃশব্দ কিন্তু ভয়ংকর বিপদ। তাই উপস্থাপকের নিরপেক্ষতা কোনো ব্যক্তিগত গুণ নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব বা মিডিয়ার সৌন্দর্য্য। এই দায়িত্বে ব্যর্থতা মানে শুধু মিডিয়ার ব্যর্থতা নয়, এটি গণতন্ত্রের প্রতিও এক গভীর অবহেলা। এই প্রেক্ষাপটে টেলিভিশন টক শোর সম্মানিত উপস্থাপক ও সঞ্চালকদের প্রতি বিনীত অনুরোধ আপনারা দায়িত্বের গুরুত্ব অনুধাবন করুন।
একটি প্রশ্ন, একটি মন্তব্য কিংবা একটি ইঙ্গিত কখনো কখনো রাষ্ট্রীয় আলোচনার গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ব্যক্তিগত মতাদর্শ নয়, পেশাগত নৈতিকতাকেই সামনে রাখুন। কারণ, একটি রাষ্ট্র সুন্দরভাবে পরিচালিত হতে হলে নাগরিকের প্রয়োজন সঠিক তথ্য, ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনা এবং নিরপেক্ষ প্রশ্ন। সেই পরিবেশ তৈরির অন্যতম কারিগর আপনারাই অর্থাৎ উপস্থাপকরাই। মিডিয়ার শক্তি তার নিরপেক্ষতায়। আর সেই নিরপেক্ষতার প্রথম ও শেষ প্রহরী হলেন উপস্থাপকরাই। এই জায়গায় ব্যর্থতা মানে শুধু একটি অনুষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়, বরং গণমাধ্যমের নৈতিক পরাজয়।
আমরা এমন টক শো চাই না, যেখানে উপস্থাপক রায় দিয়ে বসবেন। আমরা চাই এমন টক শো, যেখানে প্রশ্ন হবে ধারালো, কিন্তু ন্যায্য; আলোচনা হবে তীব্র, কিন্তু পক্ষপাতহীন। উপস্থাপক নিরপেক্ষ থাকলে আলোচনা পরিশীলিত হবে, মতভেদ থাকবে কিন্তু বিভাজন বাড়বে না। দায়িত্বশীল উপস্থাপনা ছাড়া কোনোভাবেই একটি সুস্থ মিডিয়া গড়ে ওঠে না। আর সুস্থ মিডিয়া ছাড়া কোনো সুস্থ রাষ্ট্রও টিকে থাকে না। একটি রাষ্ট্র উন্নয়নে অন্যতম ভূমিকা রাখতে পারে এই মিডিয়া। আর উপস্থাপকগণ মিডিয়ার অন্যতম প্রাণশক্তি।
লেখক : মোঃ মাজহারুল ইসলাম
কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য পেশাজীবী ও সমাজকর্মী
চাইল্ড ও মেন্টাল হেলথ্ কাউন্সিলর (ট্রেনি)
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com