শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

পি.আর. পদ্ধতি: বাস্তবতা বনাম কৌশল

  |   বৃহস্পতিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   ১৫১২ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

পি.আর. পদ্ধতি: বাস্তবতা বনাম কৌশল
৭৯

বাংলাদেশ একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার ইতিহাস বহন করে চলেছে। ঔপনিবেশিক শাসন, পাকিস্তানি কর্তৃত্ববাদ, স্বাধীনতার পরবর্তী সামরিক শাসন, দলীয় স্বৈরতন্ত্র—সব মিলিয়ে এদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এ অস্থিরতার কারণে জনগণের মৌলিক অধিকার, আর্থসামাজিক উন্নয়ন, এমনকি নিরাপদ জনজীবনও দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত।

২০২৪ সালের আগস্টে জনঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একটি কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন নতুন আশার সঞ্চার করে। মানুষ ভেবেছিল—এবার এমন এক নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর সূচনা হবে, যা গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক কার্যক্রমে দেখা যাচ্ছে, অনেক দল নিজেদের ক্ষমতায় আরোহন ও ক্ষমতা স্থায়ী করার কৌশল নিয়েই বেশি ব্যস্ত।

জুলাই সনদ ও তার তাৎপর্য-
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন গঠন করে। প্রায় এক বছরব্যাপী এই কমিশন দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে জুলাই সনদ নামে একটি সংস্কার প্রস্তাব প্রণয়ন করে।
সনদটিতে দুটি ধরণের প্রস্তাবনা রাখা হয়:
১. অসাংবিধানিক সংস্কার: সংবিধান না বদলিয়েই কার্যকর করা যায় এমন পরিবর্তন।
২. সাংবিধানিক সংস্কার: যা কার্যকর করতে হলে সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য।
এখানেই মতভেদের সূচনা। বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি ও তার সহযোগীরা বলছে—সংবিধান সংশোধন একমাত্র নির্বাচিত সংসদের এখতিয়ার। তাই তারা চায় নির্বাচন আগে অনুষ্ঠিত হোক, সনদটি স্বাক্ষরিত হোক, কিন্তু সাংবিধানিক বাস্তবায়ন হোক নির্বাচনের পর সংসদে।
অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (জানাপা), এবি পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি ইসলামপন্থী দল দাবি করছে—নির্বাচনের আগেই জুলাই সনদ সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হোক এবং সেই কাঠামোর আলোকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক।
পি.আর. পদ্ধতির প্রশ্ন:
সংসদ নির্বাচন ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক এখন প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (PR) বা অনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি।
বিদ্যমান পদ্ধতি:
বাংলাদেশে এতদিন ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট (FPTP) পদ্ধতিতে নির্বাচন হয়ে আসছে। যেখানে কোনো প্রার্থী শুধু বেশি ভোট পেলেই আসন জেতে, এমনকি সে ভোট সংখ্যাগরিষ্ঠ না হলেও।
প্রস্তাবিত পরিবর্তন:
পি.আর. পদ্ধতিতে সারাদেশে প্রতিটি দলের মোট ভোটের অনুপাতে সংসদে আসন বণ্টিত হবে। এতে ছোট ও মাঝারি আকারের দলগুলো, যাদের দেশব্যাপী ছড়ানো ভোট রয়েছে, তারা উল্লেখযোগ্য আসন পেতে পারে।
দলগুলোর অবস্থান
১. পি.আর.-এর পক্ষে থাকা দলগুলো:
• জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জানাপা, এবি পার্টি।
এরা মনে করে, তাদের সারাদেশে উল্লেখযোগ্য ভোট আছে, কিন্তু FPTP পদ্ধতিতে তা আসনে রূপান্তরিত হয় না। পি.আর. পদ্ধতিতে এ ভোট সংসদে প্রতিফলিত হবে এবং তারা সংসদীয় রাজনীতিতে “কিংমেকার” শক্তি হয়ে উঠবে।
২. পি.আর.-এর বিপক্ষে থাকা দলগুলো:
• বিএনপি ও ১২-দলীয় জোটের বড় অংশ।
তাদের ধারণা, পি.আর. পদ্ধতিতে ছোট দলগুলোর সংসদে অনুপ্রবেশ বাড়বে, ফলে বৃহৎ দলগুলোর প্রভাব কমবে এবং সরকার গঠন কঠিন হয়ে পড়বে।
বাস্তবতা বনাম কৌশল
পি.আর. পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক কেবল প্রযুক্তিগত নয়, এটি কৌশলগতও।
• বাস্তবতা হলো:
পি.আর. পদ্ধতিতে ভোটের প্রতিফলন আরও ন্যায়সংগতভাবে সংসদে ঘটবে। জনগণের বহুমাত্রিক মতামত প্রতিফলিত হবে। ছোট দলগুলিও জাতীয় সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে।
• কৌশল হলো:
জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনসহ ছোট দলগুলো আসলে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে এই প্রস্তাব তুলছে। কারণ, এভাবে তারা আবার সংসদের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে ফিরে আসতে চায়।
অন্যদিকে বিএনপি চায়—সংসদের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই থাকুক, যাতে ছোট দলগুলোর ওপর নির্ভর করতে না হয়।
সম্ভাব্য ফলাফল,
যদি পি.আর. পদ্ধতি চালু হয়:
• সংসদে অনেক দল প্রবেশ করবে।
• কোনো একক দল স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নাও পেতে পারে।
• সরকার গঠন হবে জোটনির্ভর, যা রাজনৈতিক দরকষাকষি ও অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
যদি FPTP বজায় থাকে:
• বড় দলগুলোই প্রধান নিয়ামক শক্তি থাকবে।
• ছোট দলগুলোর ভোট সংসদে প্রতিফলিত হবে না, ফলে তারা আবারও রাজপথকেন্দ্রিক রাজনীতি বেছে নিতে পারে।
জনগণের প্রত্যাশা,
এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—রাজনৈতিক দলগুলো কি জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে অগ্রাধিকার দেবে, নাকি নিজেদের কৌশলগত সুবিধাকে প্রাধান্য দেবে? জনগণ চায়:
• একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা।
• এমন নির্বাচন, যেখানে তাদের প্রতিটি ভোট মূল্যায়িত হবে।
• রাষ্ট্রীয় অস্থিরতার অবসান এবং ন্যায়সংগত শাসনব্যবস্থা।
“পি.আর. পদ্ধতি: বাস্তবতা বনাম কৌশল”—এটি বাংলাদেশের রাজনীতির বর্তমান দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে ছোট দলগুলোর কৌশল—সংসদে প্রবেশ ও প্রভাব বিস্তার, অন্যদিকে বড় দলের বাস্তবতা—ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা। এই দ্বন্দ্বের সমাধান নির্ভর করছে রাজনৈতিক দলগুলোর উপর, তারা কতটা আন্তরিকভাবে জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারে তার উপর।

অবশেষে, যদি দলগুলো কেবল নিজেদের স্বার্থে আটকে থাকে, তবে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া নতুন আশার স্রোত আবারও ব্যর্থতার দিকে ধাবিত হবে। কিন্তু যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তবে হয়তো এদেশে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা ঘটবে—যেখানে নির্বাচন হবে অংশগ্রহণমূলক, সংসদ হবে বহুমাত্রিক এবং জনগণের আস্থা ফিরে আসবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি।
লেখক:নাজিম রুবেল, প্রবাসী লেখক ও মানবাধিকারকর্মী

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us

ফলো করুন bangladoinik.com-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
ফখরুল ইসলাম
সহসম্পাদক
মো: মাজহারুল ইসলাম
Address

জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com