আনোয়ার হোসেন, নিজস্ব প্রতিবেদকঃ | রবিবার, ২২ মার্চ ২০২৬ | প্রিন্ট | ৫১ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
এখানে দিনের দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামে একটু ধীর গতিতে। সঙ্গে থাকে একঝাঁক “পরী”। আর ঠিক সেই মুহুূর্তে এ ঘাট যেন নদীর বুকের ওপরে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্যে হয়ে উঠে এক স্বপ্নমঞ্চ। যেখানে দিনের ব্যস্ততা গলে যায়, আর মানুষগুলো একটু কবিতা হয়ে ওঠে। আলো-আঁধারের ফাঁকে এই ঘাট যেন বাস্তব কল্পনার হাত মেলায়, আর বাতাসে মিশে থাকে এক অদৃশ্য মায়া।
বালাসীঘাট গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলায় যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত একটি নৌবন্দর ও দর্শনীয় স্থান। এটি গাইবান্ধা শহর থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য এই স্থান প্রতিদিনই ভ্রমণপিপাসুদের পদচারণায় মুখরিত থাকে। নদীর উত্তাল ঢেউ, নির্মল বাতাস আর নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য এখানে আগত দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে তোলে। এখানে ঘোড়ায় চড়া, নৌকাভ্রমণ এবং রেলওয়ের ফেরি থেকে নদীতে সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করা যায়।
শুধু শহর নয়, শহর ছেড়ে গ্রামগঞ্জের স্বপ্নভেজা তরুণ-তরুণীরা দিনের হাজার গল্প রেখে বিকেলে ভিড় জমায় এখানেই। কেউ ছবি তুলেন কেউ ঘোরাঘুরিতে ব্যস্ত সময় কাটান। কারো হাতে চায়ের কাপ, কারো মুখে অর্ধেক বলা কোন কবিতা। কেউ টিউশনি শেষ করে ক্লান্ত চোখে আসে; আবার কেউ শুধু বন্ধুদের সঙ্গে একটু হাসতে। কেউ চুপচাপ আসে, প্রেমে ডুবে থাকা চোখে তাকিয়ে থাকে নদীর দিকে—যেন এই জায়গাটাই তার নিজের ছোট্ট এক মহাবিশ্ব।
এ সময় এই ঘাট আর সাধারণ কোন ঘাট থাকে না—এটা হয়ে ওঠে এক যাদুকরী থিয়েটার। মোবাইলের ফ্ল্যাশে মুখে আলো পড়ে, আর সেই আলোয় গল্পগুলো আরও সুন্দর হয়ে ওঠে। চায়ের দোকানে বাজে মিষ্টি রোমান্টিক গান। ধোঁয়ার সঙ্গে ভেসে যায় অযথা দুঃখ, আর বাতাসে হালকা গলায় যেন ফিসফিস করে বলে—
“এই বিকেলগুলো শুধু তোমাদের জন্যই।”
এখানে প্রেম জন্মায় নিঃশব্দে, আবার ভেঙেও যায় সমান নরম করে। কবিতা লেখা হয় নদীর পাড়ে বসে; স্বপ্ন আঁকা হয় চোখের কোণে লুকিয়ে। কেউ দূরে বসে গল্প শোনে, কেউ সন্ধ্যার পর তারার সাথে গোপন কথা বলে, কেউ আবার সাহস জোগাড় করে প্রথমবার ভালোবাসার কথা বলতে ছুটে আসে। তাই তো মনে হয়
—বিকেল হলে এ ঘাটে সত্যিই পরীরা নামে।
কিন্তু এরা কোনো অন্য জগতের পরী নয়—এরা আমাদেরই মানুষ, বাস্তবেই তরুণ-তরুণী।
চোখে স্বপ্ন, মুখে উজ্জ্বল হাসি, আর মনের ভেতর আশ্চর্য সব গল্প নিয়ে তারা হাঁটে এই ঘাটে।
এই ঘাট যেন এক গোপন কাব্যিক বিরতি—যেখানে কেউ কাউকে খুঁজে পায়, কেউ কাউকে হারায়,
আবার কেউ নিজের ভেতরের হারিয়ে যাওয়া মানুষটাকেই নতুন করে ফিরে পায়। যারা হারায় তাদের মন যেন শেষমেশ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত গানের অংশ বিশেষ হয়ে বিষাদের কালো ছায়ায় ঢেকে যায়-
“যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে, আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে, চুকিয়ে দেব বেচা কেনা, মিটিয়ে দেব গো, মিটিয়ে দেব লেনা দেনা, বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে– তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে”।
উল্লেখ্য, একসময় বালাসী ঘাট ছিল বাংলাদেশের একমাত্র রেলওয়ে ফেরি চলাচলের স্থান। এটি বিশ্বের অন্যতম একটি ব্যতিক্রমী রেল ফেরি সার্ভিস ছিল, যেখানে সম্পূর্ণ একটি ট্রেন নদী পার হতো! রাজধানী ঢাকার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের রেল যোগাযোগ সহজ করার জন্য ১৯৩৮ সালে এখানকার তিস্তামুখ ঘাটে রেল ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়েছিল। সে সময় ইংরেজরা এ ঘাটের নামেই গাইবান্ধাকে চিনত।
১৯৯০ সালের পর যমুনা নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় রেল ফেরি সার্ভিসটি তিস্তামুখ ঘাট থেকে সরিয়ে এ উপজেলার কঞ্চিপাড়া এলাকার বালাসী স্থানে স্থানান্তর করা হয়। সেই থেকেই এটি বালাসী ঘাট নামে পরিচিত হয়ে আসছে।
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com