শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে নিঃস্ব, মানবেতর জীবন কাটছে অসহায় মানুষগুলো

আনোয়ার হোসেন, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টারঃ   |   রবিবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   ৫৮ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে নিঃস্ব, মানবেতর জীবন কাটছে অসহায় মানুষগুলো
১৪

গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া ইউনিয়নের রতনপুর। ব্রহ্মপুত্র নদের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা একটি গ্রাম। একটা সময়ে এখানে ছিল ফসলভরা মাঠ, ধানের সুবাস আর নদীপাড়ের প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা জীবন। এখন সেখানে নীরবতা, কান্না আর হাহাকার। এক মাসের ব্যবধানে গ্রামটির প্রায় ৫০ বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে অসংখ্য ঘরবাড়ি, গাছপালা ও ফসলের জমি।

এরই মধ্যে অন্তত ২০টি পরিবার পুরোপুরি গৃহহীন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া হুমকিতে রয়েছে আরও অর্ধশতাধিক বাড়ি, একটি মসজিদসহ বেশ কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা। নদীভাঙনের শিকার হয়ে অনেকেই আশ্রয় নিয়েছেন আত্মীয়ের বাড়িতে। আবার কেউবা রাস্তার ধারে গড়ে তুলেছেন অস্থায়ী বসতি। সেখানে মানবেতর জীবন কাটতে হচ্ছে অসহায় মানুষগুলোর।

এ বিষয়ে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুল হক বলেন, নদীতে পানি ওঠা-নামার সময় ভাঙন দেখা দেয়। রতনপুর এলাকায় স্থায়ী সমাধানের জন্য একটি প্রকল্পের সমীক্ষা করা হয়েছে। বরাদ্দ পেলেই কাজ শুরু করা হবে। তবে বর্তমানে কোনো কর্মসূচি হাতে নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রহ্মপুত্র ও তৎসংলগ্ন নদীগুলোর ভাঙন রোধে প্রয়োজন সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও নদীর গতিপথ নিয়ন্ত্রণে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা। কেবল জিওব্যাগ দিয়ে অস্থায়ী প্রতিরোধ করে এ ভয়াবহতা ঠেকানো সম্ভব নয়। নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধার, পার সংরক্ষণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন ৬০ বছরের আমিরন বিবি। সরেজমিন কথা হয় তার সঙ্গে। এ সময় তিনি আক্ষেপ করে বললেন, আগে হামার ঘরবাড়ি আছিল, জমিজমা আছিল। এখন সব নদীত গ্যাছে। মাঝে-মইধ্যে নদীর ধারে আইসে বসি, পুরান দিনের কথা ভাবি। আমার কষ্টের কথা কেউ শুনে না। কথা বলার সময় তার কণ্ঠে ছিল অসহায়তার ভার। চোখে যেন ভাসছিল নিঃশেষ হওয়া জীবনের ইতিহাস। তার মতো আরও অনেকেই আজ ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে শেষ আশ্রয় খুঁজছেন রতনপুরে। এখানে নদীভাঙন নতুন কোনো বিষয় নয়। স্থানীয়দের ভাষায়, প্রতি বছর নদী একটু একটু করে আমাদের গ্রামটা খায়। গত এক দশকে অন্তত পাঁচবার বড় ধরনের ভাঙনে শতাধিক পরিবার বাঞ্ছ্যুত হয়েছে। কখনো নদীর বাঁক বদল, কখনো স্রোতের দিক পরিবর্তনে গ্রামটি ক্রমেই নদীর ভেতরে ঢুকে পড়েছে। প্রতিবারই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আসে নদীভাঙন রোধে পদক্ষেপ গ্রহণের। কিন্তু সীমাবদ্ধ থেকে যায় কেবল জিওব্যাগ ফেলা আর আশ্বাসের মাঝেই। কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান মেলে না কখনোই।

মধ্য রতনপুর গ্রামের কৃষক আবদুস সাত্তার বলেন, এক মাসে দুই বিঘা জমি নদীতে গেছে। ঘরবাড়িও হুমকির মুখে। যেভাবে নদী ভাঙছে, তাতে মনে হয় কয়েক মাসের মধ্যে পুরো গ্রামই হারিয়ে যাবে। একই গ্রামের জামাত আলী বলেন, তিন বিঘা জমি নদীতে গ্যাছে। আগে আমরা গেরেস্তো মানুষ আছিলাম। এখন কামলার কাম না করলে খাওন চলে না।

জেলা প্রশাসন ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, ফুলছড়ি উপজেলার অন্তত ১৫টি গ্রাম প্রতি বছর কম-বেশি ভাঙনের কবলে পড়ে। এর মধ্যে রতনপুর, এরেন্ডাবাড়ি ও গজারিয়া সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। গত পাঁচ বছরে ফুলছড়িতে প্রায় দুই হাজার বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েক’শ পরিবার। ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকারও বেশি।

স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপকালে তারা অভিযোগ করেন, ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি আজ অবধি। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) শুধু বর্ষাকালে সামান্য কিছু জিওব্যাগ ফেলে দায় সারে। কয়েক মাসের মধ্যেই এসব ব্যাগ ভেসে যায় বা ধসে পড়ে। কোনো স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ হয়নি বহু বছর ধরে। ফলে প্রতি বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে নদীর নতুন নতুন অংশে ভাঙন দেখা দেয়। মানুষ হারায় ঘরবাড়ি, জমিজমা, আশার আলো। রতনপুরের মানুষ আজ শুধু জমি বা ঘর নয়, হারাচ্ছে তাদের শিকড়, পরিচয়, ইতিহাস। যে গ্রামে একসময় ধান কাটা উৎসব হতো, এখন সেখানে নদীর গর্জনে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের হাসি। গ্রামের প্রবীপদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আগামী বর্ষার আগেই রতনপুর হয়তো পুরোপুরি ব্রহ্মপুত্রের গর্তে তলিয়ে যাবে।

রতনপুরের মানুষের হাতে আর কিছু নেই। শুধু স্মৃতি আর প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে যাওয়া আশা। বছরের পর বছর নদীভাঙনে জীবনের সবকিছু হারিয়েও রতনপুরের মানুষ এখনও বাঁচতে চায়। নিরাপদ একটা তীর, একটু জমি, মাথা গোঁজার ঠাঁই। তাদের এখন একটাই চাওয়া-ক্ষতিপূরণ নয়, নদীভাঙন থামাও।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us

ফলো করুন bangladoinik.com-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
ফখরুল ইসলাম
সহসম্পাদক
মো: মাজহারুল ইসলাম
Address

জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com