মোঃ মাজহারুল ইসলাম: | শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | ৪৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
চায়ের দোকানদার জসিম (ছদ্মনাম)। বয়স পঞ্চাশ। স্থায়ী ঠিকানা চাঁদপুর জেলায়, জীবিকার তাগিদে এখন ঢাকার শনির আখড়ায় বসবাস করেন। ছোট্ট একটি চায়ের দোকানই তার পরিবারের ছয় সদস্যের একমাত্র আয়ের উৎস। দিন আনে, দিকে খায়। জসিমের সংসারে তার এটাই বাস্তবতা।

কিছুদিন আগে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে জানতে পারেন তার শরীরে ডায়াবেটিস নামক রোগটি ভর করেছে। কষ্ট করে হলেও নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে শুরু করেন, চিকিৎসা চালিয়ে যেতে থাকেন। জীবনের সঙ্গে লড়াইটা তখনও তার নিজের মতো করেই চলছিল। কিন্তু একসময় সেই লড়াই আরও কঠিন হয়ে ওঠে জসীমের জীবনে। জানতে পারেন গলব্লাডারে পাথর, তাও আবার অপারেশন করা ছাড়া বিকল্প কোন পথ নেই। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্হিঃবিভাগে চিকিৎসক দেখান। সিদ্ধান্ত স্পষ্ট অপারেশন করাতেই হবে। কিন্তু ভর্তি? সে সুযোগ এখনই নেই। বর্হিঃবিভাগ থেকে জানানো হয়, এক মাস পর যোগাযোগ করতে। এই ‘এক মাস’ জসিমের কাছে শুধু সময় নয়, এক গভীর অনিশ্চয়তা। প্রতিদিন হাসপাতাল আর বাসার মধ্যে ছুটে বেড়াতে গিয়ে চায়ের দোকান নিয়মিত চালাতে পারছেন না। আয় কমে যাচ্ছে, সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। একদিকে রোগ আর অপারেশনের ভয়, অন্যদিকে পরিবার চালানোর চাপ একসঙ্গে তাকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধান্ত নিতে থাকেন, গ্রামে থাকা সামান্য যে সম্পত্তিটুকু আছে, সেটুকু বিক্রি করেই অপারেশন করাবেন। সেই সিদ্ধান্ত নিয়েই তিনি একটি প্রাইভেট হাসপাতালে আসেন। জসিমের কষ্টের এই মুহুর্তে কোন একভাবে সাক্ষাত ঘটে আমার সাথে।
আমি চিকিৎসক নই, তবে একজন জনস্বাস্থ্য পেশাজীবী হিসেবে রিপোর্টগুলো বোঝার চেষ্টা করি। আমি জসিমের কাছ থেকে সব কিছু জানতে পারি। আমি জসিমকে জিজ্ঞাস করি, আমাকে ঐ হাসপাতালের বহিঃভিাগে নিয়ে যেতে পারেবন? আমার কথা শুনে, জসিম আনন্দে আপ্লুত হয়ে পড়ে। চোখ মুখে ফুটে উঠে আনন্দের জোয়ার। জসিমের আনন্দ দেখে, নিজেকে অপরাধী ভাবতে থাকি। যদি না আমি জসিমের জন্য কিছু না করতে পারি সেই ভয়ে। আমাকে নিয়ে জসিম রেসিডেন্ট সার্জনের কাছে যান। চিকিৎসক জানালেন, এই মুহূর্তে ভর্তি দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ হিসেবে বললেন, বিভিন্ন পরীক্ষা চলছে, বেড খালি নেই। আর তাই এক মাস পর আসতে বলা হয়েছে। একজন সিস্টার যোগ করলেন, æপ্রতিদিন এসে খোঁজ নিলে ভালো হয়।” সেই মুহূর্তে প্রশ্নটা না করে পারিনি-একজন গরিব চায়ের দোকানদার যদি প্রতিদিন আসা-যাওয়ার মধ্যেই সময় আর টাকা খরচ করেন, তাহলে সংসার চালাবেন কীভাবে? যেহেতু মোবাইল নম্বর আপনারা রেখেছেন, কষ্ট করে আপনারা কল করে জানালে এইসব অসহায় মানুষের জন্য অনেক উপকার হয়।
আমি আবার চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করি। চিকিৎসককে জানাই ‘ জসিমের অসুস্থতার প্রেক্ষিতে যখন আপনারা বলেছেন, অপারেশন লাগবেই, এই কথাটা যখন জসিম শুনেছেন, তখন থেকেই তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। দোকার বন্ধ থাকায় তার আয় রোজগারও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আমি মনে করি, এই কথাটা যদি এইভাবে বলা হতো রোগের অবস্থা অনুযায়ী অপারেশন অবশ্য প্রয়োজন, তবে আপাতত প্রেসক্রাইব করা ওষুধ খান, চিন্তা করবেন না। সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখুন। নির্দিষ্ট মাত্রা সুগার না থাকলে অপারেশন করা সম্ভব হবে না। আমার মনে হয়, আশ্বাসের ভাষায় বাস্তবতাটা তাকে এইভাবে বোঝানো যেত।” চিকিৎসক আমার কথাটা সর্মথন দেন এবং বলেন ঠিক বলেছেন, এইভাবে বুঝালে সে বিভিন্ন হাসপাতালে ছুটে বেড়াতো না। চিকিৎসক আমার কথাটি বুঝতে পাড়ার জন্য ধন্যবাদ জানাই।একজন কাউন্সিলর হিসেবে আমি জসিমের সঙ্গে আরও কথা বলি। একসময় জসিমের ভয়, অনিশ্চয়তা আর দুশ্চিন্তার ভার কিছুটা হালকা করার চেষ্টা করি।
তাকে বলি, সম্ভব হলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ফটোকপি রেখে যেতে। কিছুদিন পর জসিম আবার আমার কাছে আসে। কাগজপত্র দিতে দিতে হালকা হাসি দিয়ে বলে, æস্যার, এখন অনেক ভয়মুক্ত লাগছে। মনে শান্তি আসছে। দোকানেও নিয়মিত বসছি। দোকানে না বসলে অনেক ঋণী হয়ে যেতাম।” জসিমের এই কথাটুকুই যেন মনে করিয়ে দেয়, চিকিৎসা শুধু ওষুধ আর অপারেশন নয়। আমি মনে করি, রোগীর কথা শোনা, ভয় বোঝা, একটু আশ্বাস দেওয়া এগুলিও চিকিৎসারই অংশ।
জসিমের গল্প কোনো ব্যতিক্রম নয়। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এমন অসংখ্য জসিম প্রতিদিন রোগের চেয়ে বড় অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করেন।
প্রশ্ন হলো আমরা কি তাদের কষ্টটুকু একটু কমাতে পারছি? আমি দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারছি, এইরকম জসিম’রা আমাদের দেশের রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ, নিয়ম-কানুন ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখে না। ফলে যা আছে, তা-ও জসিম’রা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না। এই মানুষগুলোর প্রয়োজন শুধু চিকিৎসা নয়। তথ্য, সঠিক গাইডলাইন এবং রোগ সম্পর্কে কাউন্সেলিং। আর এখানেই স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক ও নার্সদের পেশাগত দায়িত্বের সঙ্গে মানবিকতা ও সমানুভূতির প্রশ্নটি এসে যায়।
আমি একজন জনস্বাস্থ্য পেশাজীবী ও সমাজকর্মী হিসেবে মনে করি, প্রত্যেক হাসপাতালের প্রত্যেক বিভাগে ন্যূনতম একজন প্রশিক্ষিত কাউন্সিলর থাকা জরুরি। কারণ, এই জসিম কতটা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন, তা অপারেশনের রিপোর্টে লেখা থাকবে না। অথচ তার মনকে শান্ত করতে লেগেছে শুধুমাত্র কিছু সময়, সঠিক গাইডলাইন আর সহমর্মিতা।
অস্বীকার করছি না, আমাদের সাীমাবদ্ধতা রযেছে। এই সীমাবদ্ধতা দিয়ে কিভাবে সসীম চাহিদা মিঠাতে পারি, তার জন্য দরকার সঠিক সিদ্ধান্ত এবং সঠিক পলিসি প্রনয়স আর তার সাথে প্রয়োজন মানবিক ও সহানুভূতিমূলক আচরণ। মানুষ কেবল শরীর নয়, মানুষ মনও বটে। চিকিৎসা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন ওষুধের সঙ্গে আশ্বাস যোগ হয়, প্রেসক্রিপশনের সঙ্গে মানবিক ভাষা থাকে, আর দায়িত্বের সঙ্গে থাকে সমানুভূতি। আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল হই। তাহলেই হয়তো জসিমরা আর হাসপাতালের করিডোরে ভেঙে পড়বে না। তাহলেই বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা হবে আরও একটু মানবিক, আরও একটা সুন্দর দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে।
লেখক : মোঃ মাজহারুল ইসলাম
কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য পেশাজীবী ও সমাজকর্মী
চাইল্ড এন্ড মেন্টাল হেলথ্
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com