লেখক : মোঃ মাজহারুল ইসলাম কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য পেশাজীবী ও সমাজকর্মী | বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬ | প্রিন্ট | ৫৪ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
রোজা, ঈদ ও শহরের নীরব প্রশ্ন: ভিক্ষাবৃত্তি কেন বাণিজ্য হলো?
রোজার দিনগুলোতে ও ঈদের আগে শহরের রাস্তাঘাটে ভিক্ষুকদের উপস্থিতি অন্যান্য সময়ের চেয়ে তুলনামূলক বেশি চোখে পড়ছে; তুলনামূলক বেশি ভিক্ষুকদের দেখতে পাওয়াকে আমরা মৌসুমী ভিক্ষাবৃত্তির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। কিন্তু চোখে পড়লেই আমাদের মনে দু’টি প্রশ্নের উদয় হয়।

এটা কি তাদের দারিদ্র্য? না’কি ব্যবসা? তাতে অন্য একটা গভীর প্রশ্ন আড়ালে থেকে যায়: ব্যক্তিগত নৈতিকতা ও সামাজিক বিবেক আজ কোন মর্যাদায় পৌঁছেছে?
ইদানীং এই পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হওয়া আমি গোপনে কয়েকজন ভিক্ষুকদের কাছে জানতে চাই ‘তোমার গ্রামে কি পরিবার ভাল আছে?’ সেইসব ভিক্ষুকদের উত্তর শুনে আমরা অধিকাংশ বিস্মত হয়ে যাবো, গ্রামে তাদের স্বাভাবিক জীবন, পরিবারের কোনো অনিশ্চয়তা নেই।
আর্থিক কোন অভাব অনটন নেই। অর্থাৎ এই ভিক্ষাবৃত্তি অনেকেই ‘পেশা’ হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছেন। তাদের আর্থিক অসুবিধা না থাকা সত্ত্বেও তারা এ কাজ ছাড়ছে না, তখন নৈতিক বিচরণ ও বিবেক নিয়ে প্রশ্ন ওঠা সত্যি অস্বাভাবিক নয়, বরং স্বাভাবিকই একটি বিষয়।
এ প্রশ্নে আমরা দ্রুত ‘নেতিবাচক মানুষ’ আখ্যা করে শেষ করে দিলে চলবে না। ভিক্ষাবৃত্তি যখন সংগঠিতভাবে পরিচালিত হয়-বাহ্যিক অর্থপ্রবাহ ও সিন্ডিকেটের সূত্র ধরে-তখন শুধু ব্যক্তিকে শাস্তি দিয়ে সমস্যা মিটবে না; সমস্যাটি আরও গোপনীয়ভাবে বেড়ে যাবে। তাছাড়া, যদি কোনো ব্যক্তি জানে যে তার কাজ অন্যায়, তবুও তাতে লিপ্ত হন-তাতে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় ওই ব্যক্তির নিজের বিবেকের। বিবেকই যে বড় আদালত-তার গন্ডী যদি ছিন্ন হয়, সমাজও অসামর্থ্যবোধে পতিত হবে।
সমাধানকে যদি আমরা তিন স্তরে ভাগ করি-ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়-তবে বাস্তবসম্মত পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব।
ব্যক্তিগত স্তরে প্রয়োজন সচেতনতা আর বিচক্ষণ সহানুভূতি। দান করা মানেই সবসময় সমস্যা শেষ করা নয়; সহায়তার আগে প্রশ্ন করা উচিত-কীভাবে দেয়া হচ্ছে, কি́ভাবে তা ব্যবহার হবে। অনুগ্রহ ও সহমর্মিতার সঙ্গে সতর্কতা যোগ করলে ‘সহায়তা’ পণ্যে পরিণত হওয়ার সুযোগ কমে যায়।
ধর্মীয় ও স্থানীয় নেতা-নেত্রীরা যদি ঈদ-রোজার সময়ে টার্গেটেড সহায়তার প্রচলন করেন-যেমন পরিবারভিত্তিক তালিকা, স্থানীয় যাচাই-তবে অর্থ উপযোগীভাবে পৌঁছাবে।
সামাজিক স্তরে দরকার বিকল্প আয়-উপায় ও পুনর্বাসন কর্মসূচি। মৌসুমী ভিক্ষুকদের মধ্যে যাদের সত্যিকারের কর্মসংস্থানের অভাব, তাদেরকে ক্ষুদ্র উদ্যোগ, প্রশিক্ষণ ও অস্থায়ী কাজের ব্যবস্থা করলে তারা দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত বদলে নিতে পারবে।
একই সঙ্গে স্থানীয় কমিউনিটি-নেটওয়ার্ক গঠন করে তথ্যভিত্তিক নজরদারি চালালে সংগঠিত চক্র শনাক্ত করা সহজ হবে—শেমিং বা কড়া দমন নয়, কারণ সেগুলো সমস্যাকে গোপনে ঠেলে দেয়।
রাষ্ট্রীয় নীতিতে অবশ্যই সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি—টার্গেটেড নগদসহায়তা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সেবার সম্প্রসারণ, এবং কর্মসংস্থান-ভিত্তিক নীতি। যদি ভিক্ষাবৃত্তি কোনো কোর্ট-অফ-অর্গানাইজড নেটওয়ার্কের অংশ হয়, আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত; তবু একই সঙ্গে মানবিক পুনর্বাসন থাকবে-শুধু শাস্তি নয়, সুযোগও দিতে হবে।
বিবেককে জাগানোই সবচেয়ে বড় কাজ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, কমিউনিটি ক্লাব-এসব জায়গায় ‘মানবতা, সৎ উপার্জন ও সম্মান’ এর বার্তা যদি ধারাবাহিকভাবে উচ্চারিত হয়, সমাজে ছোট ছোট নৈতিক পুনরুচ্চারণ সম্ভব। দান করলে মানুষকে সম্মান সহকারে ফিরিয়ে দেয়া ও তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করাই প্রকৃত বিজয়। আমাদের দরকার শুধু আইন নয়, ভাবনা-পরিবর্তন; শুধু সহানুভূতি নয়, বিবেচনাশীল সহায়তা।
ভিক্ষাবৃত্তি কেবল রোধ বা নিষেধের বিষয় নয়; এটা আমাদের সম্মান, নৈতিকতা ও সামাজিক নীতির পরীক্ষা। আমরা যদি ‘মানব হওয়া’ আর ‘স্বার্থসাধন’-এই দুইকে পৃথক করতে শিখি, এবং সেদিকে কাজ করে দাঁড়াই-তবে সেই সমাজে ভালো থাকার স্বপ্ন ফেরত আসবে। মানবিকতা এবং সম্মানজক কর্মসংস্থানের সুযোগ-এই দুই মিলেই হবে সত্যিকারের পরিবর্তন।
লেখক : মোঃ মাজহারুল ইসলাম
কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য পেশাজীবী ও সমাজকর্মী
চাইল্ড এ্যান্ড পেরেন্ট ও মেন্টাল হেলথ্ কাউন্সিলর (ট্রেনি)
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com