শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

সেলাই মেশিনে স্বপ্ন কিশোরীদের চোখে

আনোয়ার হোসেন   |   বুধবার, ২৬ মার্চ ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   ১৫৮ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

সেলাই মেশিনে স্বপ্ন কিশোরীদের চোখে
১২

গুণে গুণে তারা চল্লিশজন কিশোরী। সুরাইয়া, ফারজানা, পাফিয়া, সুমনা খাতুন, রাফিয়াসহ সবাই বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। কেউ সবে মাধ্যমিক শেষ করে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ছে, কেউবা উচ্চ মাধ্যমিক পেরিয়ে স্নাতকের শিক্ষার্থী। তাদের কারও বাবা প্রান্তিক কৃষক, কেউবা রিকশা-ভ্যান কিংবা ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চালক আর কারও বাবা কৃষি শ্রমিক কিংবা দিনমজুর। ‘নুন আনতে পান্তা ফুরানো’ অবস্থা এসব পরিবারের। অসচ্ছল কিন্তু অদম্য এই চল্লিশ কিশোরীর সবাই পরিবারের অভাব-অনটন আর নানা সামাজিক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে কোনোরকম মানসিক শক্তিতে শিরদাঁড়া সোজা রেখে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে। আত্মকর্মসংস্থান ও যৌতুকবিরোধী প্রকল্পের আওতায় অসচ্ছল কিশোরীদের স্বাবলম্বী করার জন্য সম্প্রতি গাইবান্ধার এই চল্লিশ কিশোরীকে দেওয়া হয়েছে প্রশিক্ষণ শেষে সেলাই মেশিন।

দীর্ঘ চার মাস প্রশিক্ষণ শেষে তাদের দেওয়া হয় এসব সেলাই মেশিন। সেই সঙ্গে টেইলারিং শপ গড়ে তুলতে প্রত্যেককে মূলধন বা ব্যবসার পুঁজি হিসেবে দেওয়া হয় এককালীন নগদ অর্থ সহায়তা। প্রশিক্ষণ সেলাই মেশিন ও ব্যবসা পরিচালনার পুঁজি পেয়ে দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকা এই কিশোরীদের বিষণ্ণ মুখে ফুটল হাসির ঝিলিক। তারা এবার ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সংগঠন ফোরাম-৮৬ ইউএসএর অর্থায়নে এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কর্মীর হাতের সহযোগিতায় গত চার মাস ধরে গাইবান্ধা সদর ও সাদুল্লাপুর উপজেলায় দুটি কেন্দ্রে চল্লিশ কিশোরীকে কাটিং-সুইং, এমব্রয়ডারি, ব্লক এবং শো-পিস তৈরির প্রশিক্ষণ সমাপনী অনুষ্ঠান মঞ্চের সামনে চেয়ারে বসে ছিলেন অতিদরিদ্র পরিবারের চল্লিশ অসচ্ছল কিশোরী। সবার সামনে একটি করে নতুন সেলাই মেশিন। এই মেশিনগুলো যেন তাদের জীবনের গল্প বদলে দেওয়ার হাতিয়ার।

বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ সেলাই মেশিন ও ব্যবসার পুঁজি পেয়ে আনন্দে উচ্ছ্বসিত কিশোরীরা বলেন, প্রশিক্ষণ শেষে বিনামূল্যে পাওয়া নতুন সেলাই মেশিন আমাদের সংসারের অভাব দূর করবে। বাড়িতে টেইলারিং শপে এখন সেলাইয়ের কাজ করে আয়-রোজগার করতে পারব। অভাব, কষ্ট থাকবে না। সচ্ছলতা ফিরবে আমাদের সংসারে। এই উদ্যোগ আমাদের ভাগ্য পরিবর্তনে সহায়তা করেছে। নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে। আমরা এখন ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছি। সাদুল্লাপুর উপজেলা থেকে সেলাই মেশিন নিতে এসেছিলেন সুমনা খাতুন নামের এক কলেজ শিক্ষার্থী। সুমনার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, তার বাবা একজন প্রান্তিক কৃষক। মা গৃহিণী। বাবার সামান্য উপার্জনের টাকা দিয়ে মা পাঁচ সদস্যের পরিবারের খরচ চালিয়ে আসছেন। অর্থের অভাবে সুমনার পড়াশোনা প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এ সময় তিনি জানতে পারেন আত্মকর্মসংস্থান ও যৌতুকবিরোধী প্রকল্পের আওতায় অসচ্ছল কিশোরীদের স্বাবলম্বী করার প্রশিক্ষণের কথা।

পরে চার মাসের প্রশিক্ষণ শেষে একটি সেলাই মেশিন এবং ব্যবসা শুরুর পুঁজি পেয়ে অর্থকষ্ট থেকে মুক্তির বার্তা খুঁজে পেয়েছেন তিনি। সুমনা বলেন, গরিব পরিবারের সন্তান হওয়ায় আমাদের নানা টানাপড়নের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বাবার একার পক্ষে পরিবারের এতগুলো লোকের খাবার আর পড়াশোনার খরচের জোগান দেওয়া ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। এ অবস্থায় আমার পড়াশোনা চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছিল। আমি সেলাই প্রশিক্ষণ শেষ করে একটি সেলাই মেশিন পেলাম, টেইলারিং শপ গড়ে তোলার মূলধন পেলাম। এখন সেলাইয়ের কাজ করে পরিবারকে সাহায্য করার পাশাপাশি নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেই চালিয়ে নিতে পারব। আমি প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সংগঠন ফোরাম-৮৬ ইউএসএকে ধন্যবাদ জানাই। রাফিয়ার বাবা কৃষি শ্রমিক, অন্যের জমিতে শ্রম দেন। বাবার স্বল্প আয়ে সংসারের চাকাই ঘোরে না ঠিকমতো।

রাফিয়া সাদুল্লাপুরের একটি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ালেখা করছে। বাবা ঠিকমতো পড়ার খরচ দিতে পারেন না, কিন্তু অদম্য রাফিয়া পড়াশোনা করবেই। নিজে কিছু একটা করতে চায় সে। এই বয়সে করবেই বা কী। কার কাছে শুনতে পেল সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কথা। নিজের নাম লেখাতে চাইল সেখানে। পরিবারের অবস্থার কথা বিবেচনা করে এবং পড়াশোনার ব্যাপক আগ্রহ দেখে রাফিয়াকে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি করিয়ে নেওয়া হয়। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই দ্রুত সেলাইয়ের কাজ শিখে যায় রাফিয়া। স্বপ্ন তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় আরও বেশি করে কাজ করার।

প্রতিদিনই সেলাইয়ের ফোঁড়ে স্বপ্ন বুনেছে কিশোরী মেয়েটি। সেলাইয়ের কাজ শেখার পর তার হাতে তুলে দেওয়া হয় সেলাই মেশিন। নতুন সেলাই মেশিন পেয়ে রাফিয়ার মুখে ফুটে ওঠে স্বপ্ন জয়ের হাসি। শুধু রাফিয়াই নয়, গাইবান্ধা সদর ও সাদুল্লাপুর উপজেলায় সেদিন সেলাই মেশিন পেয়েছেন বিভিন্ন বয়সি সুবিধাবঞ্চিত চল্লিশ কিশোরী। সেলাইয়ের কাজ করে দারিদ্র্যকে বিদায় জানাতে চান তারা। রাফিয়ার মতো সেই চল্লিশ কিশোরী জীবন বদলাবার হাতিয়ার পেয়ে এখন স্বপ্ন জয়ের পথে।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us

ফলো করুন bangladoinik.com-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
ফখরুল ইসলাম
সহসম্পাদক
মো: মাজহারুল ইসলাম
Address

জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com