শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

হাসপাতালে দায়িত্বপালন শুধু পেশাগত নয়, এটি এক গভীর মানবিক অঙ্গীকার

মোঃ মাজহারুল ইসলাম   |   সোমবার, ১২ জানুয়ারি ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৬৬ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

হাসপাতালে দায়িত্বপালন শুধু পেশাগত নয়, এটি এক গভীর মানবিক অঙ্গীকার
৮৯

হাসপাতাল অন্য দশটি সাধারণ প্রতিষ্ঠানের মত নয়। আমরা যদি শুধুমাত্র একটি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখে থাকি, তাহলে স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক র্দশনই অপূর্ণ থেকে যাবে। বাস্তবে হাসপাতাল এমন একটি সামাজকি প্রতিষ্ঠান, যেখানে মানুষ আসে জীবনের সবচেয়ে দুর্বল ও সংকটময় সময়ে। ফলে হাসপাতালের স্টাফদের দায়িত্ব¡ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের দায়িত্ব থেকে গুণগতভাবে ভিন্ন এবং বহুমাত্রিক। এখানে দায়িত্ব¡ কেবল নিয়ম মেনে কাজ সম্পন্ন করা নয়; বরং মানবিকতা, সমানুভূতি ও প্রো-অ্যাকটিভ মনোভাবের সমন্বয় ঘটানোই হলো প্রকৃত সেবার মানদ- বা হাসপাতালের স্টাফদের প্রকৃত দায়িত্ব পালন করা। বর্তমান সময়ে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি বড় র্দুবলতা, স্বাস্থ্যসেবাকে অধকিাংশ ক্ষেত্রেইে এখনও প্রধানত ‘সার্ভিস ডেলিভারী সিস্টেম’ হিসেবে দেখা হয়, ‘মানবিক সেবাব্যবস্থা’ হিসেবে নয়। রোগীকে দেখা হয় একটি কেস নম্বর, বেড নম্বর বা ফাইল হিসেবে অথচ রোগী একজন পূর্ণ মানুষ। মানসিক চাপ, সামাজিক প্রেক্ষাপট ও আর্থিক উদ্বেগ সবার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই বাস্তবতা উপলব্ধি না করলে স্বাস্থ্যসেবার মান কাঙ্খিত র্পযায়ে আমাদের পৌঁছানো কখনোই সম্ভব হবে না। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হাসপাতালের ফ্রন্টলাইন স্টাফদের ভূমিকা।

রসিপিশনে কর্মরত স্টাফরা কেবল তথ্য প্রদানকারী নন; তারা হাসপাতালের ‘প্রথম মুখ’ বা হাসপাতালের ‘দর্পন’ বলা চলে। আরও গুরুত্ব দিয়ে বলতে চাইলে হাসপাতালের গেইটে নিরাপত্তার দায়িত্বে আনসার বা অন্যান্য স্টাফদেরকেও এর অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে। রোগী ও স্বজনের সঙ্গে তাদের আচরণই অনকে সময় পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। যদি রিসিপশন র্পযায়ে তথ্যের ঘাটতি, অসহযোগিতা বা বিরক্তিকর আচরণ থাকে, তবে রোগীর মানসিক চাপ আরও বেড়ে যায়। তাই রিসিপশনে কর্মীদের সার্বিক সেবাজ্ঞান, কার্যকর যোগাযোগ দক্ষতা এবং মানবিক আচরণ নশ্চিতি করা একটি কাঠামোগত প্রয়োজন, জেনে রাখতে হবে এটা কোনো বিলাসিতা নয়। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য সেবাদাতাদের ক্ষেত্রেও দায়িত্ব পালনের ধারণায় পরিবর্তন আনা জরুরি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের দক্ষতা যতই উন্নত হোক না কেন, রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে না শোনা হলে বা রোগীকে সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণে সুযোগ না দিলে সেবার প্রতি আস্থা কখনোই তৈরি হবে না। সমানুভূতিশীল আচরণ রোগীর আরোগ্য প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে এবং চিকিৎসা গ্রহণে অনীহা কমায়। র্অথাৎ মানবিক আচরণ কেবল নৈতিক বিষয়ই নয়, এটি চিকিৎসার র্কাযকারিতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী মানবতার পুনর্গঠনে স্বাস্থ্য’কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করে WHO প্রতিষ্ঠিত হয়। ৭ এপ্রিল ১৯৪৮ সালে উক্ত প্রতিষ্ঠানটি কার্যকর হবার পর থেকে আজও WHO বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সমন্বিত, ন্যায়সঙ্গত ও প্রযুক্তিনির্ভরভাবে পরিচালনা করে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর স্বীকৃত ছয়টি Health Dimension শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, আধ্যাত্মিক, বৌদ্ধিক ও পরিবেশগত এই ছয়টি দৃষ্টিভঙ্গি আমাদেরকে দেখিয়ে দেয়, কীভাবে সামগ্রিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হলে মানবিক সম্পর্কের উন্নয়ন অপরিহার্য। রোগীদের জন্য বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ, অ্যাটেনডেন্টদের জন্য নির্ধারিত জোন এবং সবার জন্য তথ্য সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তুললে সম্পর্ক উন্নয়নের মজবুত ভিত্তি স্থাপন হয়। আরও সহজ করে এইভাবে বলতে পারি ঐবধষঃয উরসবহংরড়হ ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বর্পূণ। স্বাস্থ্য মানে শুধু রোগমুক্ত থাকা নয়; শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আবেগগত সুস্থতার সমন্বয়। হাসপাতালের সেবা যদি কেবল শারীরিক চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে এই ঐবধষঃয উরসবহংরড়হ এ বড় একটি অংশ উপেক্ষিত থেকে যায়। রোগীর মানসিক নিরাপত্তা, সম্মানবোধ ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করা স্বাস্থ্যসেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া উচতি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রো-অ্যাকটিভ দায়িত্ববোধ। হাসপাতালে সেবা মানে রোগী প্রশ্ন করলে উত্তর দেয়া নয়; বরং রোগীর সম্ভাব্য উদ্বেগ আগে থেকেই অনুধাবন করে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা দেয়া। রোগী বা রোগীর এ্যাটেনডেন্টদের মানসিক চাপে সে নিজেও বুঝতে পারেনি, তার এই সময় কি কি করা দরকার বা কি কি বিষয়ে জেনে রাখা প্রয়োজন। আর তাই প্রো-এ্যাকটিভ মানসিকতা হাসপাতালে কর্মরত প্রতিটি স্টাফের একান্ত প্রয়োজন। যদিও এটি সময়সাপেক্ষ হলেও দীর্ঘমেয়াদে রোগী সন্তুষ্টি, প্রতিষ্ঠানের সুনাম এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা বাড়ায়। তবে মানবিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায় শুধুমাত্র স্টাফদের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। প্রতিষ্ঠান পরচিালনা ও নীতনির্ধারণী পর্যায়ে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।

নিয়মিত আচরণগত প্রশিক্ষণ, কর্মীদের মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা, যুক্তিসংগত কর্মঘণ্টা এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থায় মানবিক আচরণকে অর্ন্তভুক্ত না করলে কাঙ্খিত পরিবর্তন ঘটানো যাবে না। হাসপাতালের দায়িত্ব কেবল পেশাগত চুক্তির বিষয় নয়; আর তাই মানবিক স্বাস্থ্যসেবা কোনো ব্যক্তিগত সদিচ্ছার ফল নয়; এটি একটি সামাজিক ও মানবিক অঙ্গীকার। আজ যে ব্যক্তি রোগী হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে, আগামীকাল সে-ই হতে পারে একজন সেবাগ্রহীতা বা সেবাদাতা অথবা নীতনির্ধারক কিংবা সাধারণ নাগরিক। এই পারস্পরিক নির্ভরতার বাস্তবতা উপলব্ধি করেই আমাদের স্বাস্থ্যসেবাকে আরও মানবিক, দায়িত্বশীল ও মর্যাদাসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে হবে। আর তাই আমাদের স্বাস্থ্যনীতিকে আরও মানবিক, দায়িত্বশীল ও রোগীকেন্দ্রকি করে গড়ে তুলতে হবে। আর এও সত্য মানবিকতা যদি নীতিতে না থাকে বা না রাখা হয়, তবে তা বাস্তবে টেকসই হওয়া কখনোই সম্ভব নয়। লেখক ঃ মোঃ মাজাহরুল ইসলাম কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য পেশাজীবী ও সমাজকর্মী

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us

ফলো করুন bangladoinik.com-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
ফখরুল ইসলাম
সহসম্পাদক
মো: মাজহারুল ইসলাম
Address

জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com