আনোয়ার হোসেন, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার | শনিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৫ | প্রিন্ট | ৫৭৭৭ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বালাশী ঘাট এবং জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরাবাদ ঘাট। ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার দুই তীরের এই দুই ঘাট একটা সময়ে উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগের প্রাণকেন্দ্র ছিল। ব্রিটিশ আমলে চালু হওয়া রেলওয়ে ফেরি সার্ভিস দীর্ঘদিন ধরে উত্তরাঞ্চলের মানুষের অর্থনীতি, কৃষি ও যাতায়াতের মূল ভরসা হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে কৃষিপণ্য পরিবহন ও সাধারণ যাত্রী চলাচলে এই রুটের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। ২০০০ সালে যমুনা বহুমুখী সেতু চালুর পর এখানে ফেরি সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে থেকে যায় সেই নৌপথের সোনালি অধ্যায়। পরবর্তী সময়ে গণদাবির মুখে ২০১৭ সালে একনেক সভায় অনুমোদন পায় বালাশী-বাহাদুরাবাদ ফেরিঘাট টার্মিনাল প্রকল্প। প্রাথমিক বাজেট ধরা হয় ১২৪ কোটি টাকা। পরে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৪৫ কোটি টাকায়। ২০১৯ সালে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী বালাশী ও বাহাদুরাবাদে নির্মিত হয় ফেরিঘাট টার্মিনাল, টোল বুথ, অফিস ভবন, আনসার ব্যারাক, ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, পাইলট বিশ্রামাগার, মসজিদ, খাদ্যগুদামসহ নানা অবকাঠামো। একই সঙ্গে নদী খননে ব্যয় করা হয় প্রায় ২৪ কোটি টাকা। কিন্তু ২০২২ সালে উদ্বোধনের পর প্রকাশ পায় বিস্ময়কর এক বাস্তবতা। নদীর চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য, প্রবাহ ও খরস্রোতের কারণে এই রুটে ফেরি বা লঞ্চ কোনোটিই টেকসইভাবে চালানো সম্ভব হয়নি। আদলে ২০২১ সালের ডিসেম্বরেই বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কারিগরি কমিটি জানিয়েছিল, এই নদীপথ ফেরি চলাচলের উপযোগী নয়।
কিন্তু সেই প্রতিবেদন তখন প্রকাশ্যে আনা হয়নি। সমীক্ষা ছাড়া নেওয়া এই প্রকল্পের ব্যর্থতা তখনই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। অথচ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে বাস্তবায়ন এগিয়েছে নিজস্ব গতিতে। বিশেষজ্ঞদের মতে-কোনো সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি আর তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তের কারণে প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়েছিল। ফল হয়েছে আজকের এই অচল অবকাঠামো। যমুনা সেতু চালুর পরও উত্তরাঞ্চলের মানুষদের ভোগান্তি পুরোপুরি থামেনি। সেতুর ওপর চাপ বাড়তে থাকে, যানজট ও অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ একসময়ে বড় সমস্যায় রূপ নেয়। তখন আবারও জোরালোভাবে ওঠে বিকল্প ফেরি রুট চালুর দাবি। এই দাবি পূরণের অংশ হিসেবে ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায় বালাশী-বাহাদুরাবাদ ফেরিঘাট টার্মিনাল প্রকল্প। সেসময় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, প্রকল্প শেষ হলে উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হবে, অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে এবং যমুনা সেতুর ওপর চাপও কমবে।
প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার পর কাজ এগোতে থাকে। এলাকাজুড়ে জেগে ওঠে আশার আলো। স্থানীয়রা ভেবেছিলেন, অনেক বছরের ভোগান্তি এবার কাটবে। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ধান, আলু, সবজি ও মাছ সহজেই ফেরি পথে ঢাকায় পাঠাতে পারবেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে আসবে নতুন সম্ভাবনা। ২০২২ সালের ৯ এপ্রিল তৎকালীন নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। কিন্তু কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা ফেরিঘাটে কোনো ফেরি আনা হয়নি। ফেরি না এনে উদ্বোধন করা হয় লঞ্চ সার্ভিসের, যা কয়েক মাস যেতে না যেতেই বন্ধ হয়ে যায় নাব্যসংকটের কারণে। সরেজমিন ফুলছড়ির বালাশী ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল টার্মিনাল ভবন দাঁড়িয়ে আছে নির্জন, ব্যবহারহীন অবস্থায়। টোল বুথে ঝুলছে তালা, আনসার ব্যারাক খালি পড়ে আছে, খাদ্যাগারে কোনো কার্যক্রম নেই। প্রকল্পের ব্যর্থতার দায় কার-সেই প্রশ্ন এখন জনমনে। প্রকল্পে জড়িত বিশেষজ্ঞ ও সরকারি কর্মকর্তারা এখন নীরব। তবে নাগরিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় বিশিষ্টজনরা বলছেন, এ ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ব্যর্থতার দায় অবশ্যই রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
গাইবান্ধা প্রেস ক্লাব সভাপতি অমিতাভ দাশ বলেন, যে প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা খরচ হলো অথচ মূল লক্ষ্যই বাস্তবায়ন করা গেল না, সেটি সরাসরি নীতি ও পরিকল্পনার ব্যর্থতা। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়া এমন প্রকল্প হাতে নেওয়া শুধু অপচয় নয় বরং এটি উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রতি মানুষের আস্থাকেও ক্ষুণ্ণ করে। সরকারও ব্যর্থতার বিষয়টি আড়াল করতে পারেনি। সম্প্রতি গাইবান্ধার বালাশীঘাটের নৌ টার্মিনাল পরিদর্শনে আসেন বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান কমোডর আরিফ আহমেদ মোস্তফা। এ সময় তিনি বলেন, নদীর নাব্যসংকটের কারণে ফেরি বা লঞ্চ চালানো সম্ভব নয়। বিকল্প ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে সরকার। পরে বিআইডব্লিউটিএ ঘোষণা দেয়, বাহাদুরাবাদের টার্মিনালে প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং বালাশী টার্মিনালে ইকোপার্ক ও হাইড্রোলজি অফিস করা হবে। অর্থাৎ ফেরিঘাট যেভাবেই হোক চালু করা সম্ভব না, তাই বিকল্প ব্যবহার খোঁজা হচ্ছে।
প্রশ্ন উঠেছে, যে উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল-উত্তরাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ও কৃষিপণ্যের সরবরাহ সহজ করা সেই উদ্দেশ্য কি পুরণ হলো? উত্তর হলো না। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই ব্যর্থতার দায় কে নেবে? জনগণের করের ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয় হলো অথচ ফেরি এক দিনও চালু হলো না। বালাশী-বাহাদুরাবাদ নৌরুটের গল্প আজ কেবল অচল ফেরিঘাটের নয়, এটি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও জবাবদিহি সংকটের প্রতিচ্ছবি। কোটি কোটি টাকা খরচ করেও যখন মানুষ সেবা পায় না, তখন উন্নয়নের স্লোগান মানুষের কাছে ব্যঙ্গের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয় মানুষ তাই এখনও অপেক্ষায়, এক দিন হয়তো ব্রহ্মপুত্র-যমুনায় আবারও চলবে ফেরি, কিন্তু তার আগে এই ব্যর্থতার জন্য দায়ীদের জবাবদিহি ও শান্তি নিশ্চিত করতে হবে যাতে ভবিষ্যতের কোনো প্রকল্প আর এমন অচল স্বপ্নে রূপ না নেয়।
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com