মোঃ মাজহারুল ইসলাম: | শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | ৪৫ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এক নতুন অধ্যায় রচনা করেছে। ২৯৯টি আসনে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—তারা স্থিতিশীলতা চায়, কার্যকর সংসদ চায় এবং সর্বোপরি একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র চায়।

নির্বাচনের আগে বহু আলোচনা ছিল যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠন করতে পারে। যদিও প্রত্যাশিত ফল তারা পায়নি, তবুও অতীতের তুলনায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে জয় এবং বহু আসনে বিপুল ভোটপ্রাপ্তি প্রমাণ করে—দলটি জনগণের একটি বড় অংশের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে। তাদের নীতিনির্ধারকদের এখন আত্মসমালোচনার পাশাপাশি এই অর্জনের ইতিবাচক বিশ্লেষণ করতে হবে, কোন সামাজিক, নৈতিক বা সাংগঠনিক শক্তির ভিত্তিতে তারা এ সমর্থন পেলেন, এবং ভবিষ্যতে তা কীভাবে টেকসই জনকল্যাণে রূপ দেওয়া যায়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। জনগণ তাদের প্রতি আবারও আস্থা রেখেছে, এটি নিছক রাজনৈতিক বিজয় নয়, এটি দায়িত্বের নতুন অঙ্গীকার। একটি দল যখন বারবার জনগণের রায় পায়, তখন তা প্রমাণ করে, তাদের প্রতি জনগণের আস্থা এখনো অটুট। কিন্তু আস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন আত্মসমালোচনার সাহস।
আমি যদি এভাবে বলি, অভিজ্ঞতা কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, এটি ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। তবে সেই অভিজ্ঞতা তখনই মূল্যবান হবে, যখন অতীতের ভুল-ত্রুটি, সীমাবদ্ধতা ও বিতর্কগুলোকে নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করে নীতিগত সংশোধন আনা হবে। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই—জনগণ ক্ষমতা দেয়, আবার সংশোধনের সুযোগও দেয়। এবার প্রত্যাশা একটাই: পূর্বের চেয়ে আরও পরিণত, আরও জবাবদিহিমূলক ও আরও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র পরিচালনা করবে।
রাষ্ট্র পরিচালনা কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়; এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। ক্ষমতা স্থায়ী নয়, কিন্তু সুশাসনের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। জনগণ এবার প্রত্যাশা করছে—সরকার হবে আরও পরিণত, আরও মানবিক, আরও জবাবদিহিমূলক।এই নির্বাচনের আরেকটি বড় তাৎপর্য হলো—দীর্ঘ সময় পর জাতীয় সংসদ একটি কার্যকর বিরোধী দলসহ পূর্ণাঙ্গ কাঠামো ফিরে পেয়েছে। শক্তিশালী বিরোধী দল গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য; তারা কেবল সমালোচক নয়, বরং নীতিগত ভারসাম্য রক্ষার অংশীদার। সংসদীয় বিতর্ক, জবাবদিহিতা ও নীতিগত পর্যালোচনার মধ্য দিয়েই গণতন্ত্র পরিপক্ব হয়। অর্থাৎ গণতন্ত্র তখনই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, যখন সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই রাষ্ট্রের স্বার্থে প্রতিযোগিতামূলক সহযোগিতায় অবতীর্ণ হয়।
বাংলাদেশের মানুষ এখন বৈষম্যহীন সমাজ, কর্মসংস্থানের সুযোগ, নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা, উন্নত শিক্ষা এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন চায়। সরকার যদি পূর্বের অভিজ্ঞতাকে পাথেয় করে নতুন নীতিগত সংস্কার আনে, তবে এই মেয়াদ হতে পারে এক নতুন মানদণ্ড।
আমি একজন সমাজকর্মী হিসেবে মনে করি, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আনন্দের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোরও ইতিবাচক মনোভাব থাকা জরুরি। কারণ শেষ পর্যন্ত বিজয় বা পরাজয়ের ঊর্ধ্বে রয়েছে দেশ ও জনগণের স্বার্থ।বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় বাস্তবতা অতীতের চেয়ে ভিন্ন। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্যঝুঁকি—সবকিছুই নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একজন সমাজকর্মী হিসেবে আমি মনে করি, নির্বাচনের উচ্ছ্বাসের চেয়ে বড় হলো সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।
শক্তিশালী বিরোধী দলসহ একটি নতুন সরকারের কাছে জনগণের চাওয়াগুলো ১. অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি, ২. বৈষম্যবিরোধী রাষ্ট্রনীতি, ৩. সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা, ৪. ক্ষুধামুক্ত ও পুষ্টিসমৃদ্ধ বাংলাদেশ, ৫. গুণগত ও মানবিক শিক্ষা ব্যবস্থা, ৬. প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, ৭. আইনের শাসন ও মানবিক রাষ্ট্রচিন্তা, ৮. রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুশাসন, ৮. কর্মসংস্থান ও যুব উন্নয়ন, ৮. শক্তিশালী সংসদীয় সংস্কৃতি।
এই নির্বাচন প্রমাণ করেছে—জনগণ গণতন্ত্রে বিশ্বাস রাখে। তারা শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে তাদের মত প্রকাশ করেছে। এখন দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর—ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয়ের—যেন তারা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রস্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। গণতন্ত্র কেবল ভোটে সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রতিদিনের সুশাসন, ন্যায়বিচার ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার নাম। যদি নতুন সরকার ও বিরোধী দল জনগণের এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আন্তরিক হয়, তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়—এটি হবে একটি নতুন রাষ্ট্রনৈতিক পুনর্জাগরণের সূচনা।
লেখক: মোঃ মাজাহরুল ইসলাম
কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য পেশাজীবী ও সমাজকর্মী
চাইল্ড এ্যান্ড মেন্টাল হেলথ্ কাউন্সিলর (ট্রেনি)
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com