সুজন আলী, রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি | শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | প্রিন্ট | ৩১৯ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
সীমান্তের অবহেলিত জনপদে এক সময় আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছিলেন ফাতেমা বেগম। অভাবের সাথে লড়াই করে, শূন্য হাতে শুরু করে গড়ে তুলেছিলেন পাপোশ তৈরির এক বিশাল সাম্রাজ্য। যার হাত ধরে স্বাবলম্বী হয়েছিল সীমান্তবর্তী এলাকার প্রায় ৫০০ পরিবার, সেই সংগ্রামী নারী উদ্যোক্তা ফাতেমা আজ নিজেই পরিস্থিতির শিকার হয়ে সব হারিয়ে নিরুদ্দেশ। দেনার দায়ে কারখানা বিক্রি করে তিনি এখন কোথায় আছেন, তা কেউ জানে না।
ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈল শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে কাশিপুর ইউনিয়নের পশ্চিম কাদি হাট জোতপাড়া গ্রাম। এই গ্রামেরই অতিসাধারণ এক নারী ফাতেমা। অভাবের সংসারে শৈশবে স্কুলের বারান্দায় পা রাখা হয়নি তার। অল্প বয়সে বিয়ে, তারপর দুই সন্তানের জননী হওয়া—সব মিলিয়ে দারিদ্র্য যখন পরিবারটিকে গ্রাস করছিল, তখনই ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেন তিনি। ১৯৯৯ সালে স্বামী বাবুল হক ভারত থেকে ফিরে এসে মুদির দোকান দিলেও পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন। সেই সংকটময় মুহূর্তে স্থানীয় একটি এনজিও থেকে মাত্র ৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে চারটি মেশিন দিয়ে বাড়িতেই পাপোশ তৈরির কাজ শুরু করেন ফাতেমা।
জাতীয় পুরস্কার ও সাফল্য ২০০৪ সালে শুরু করা সেই ক্ষুদ্র উদ্যোগ এক সময় মহীরুহ আকার ধারণ করে। নিজের মনোবল আর কঠোর পরিশ্রমে ফাতেমার কারখানায় মেশিনের সংখ্যা ৪ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭টিতে। তৈরি হয় দুটি বড় কারখানা। তার কারখানায় তৈরি বাহারি নকশার টেকসই পাপোশের কদর ছড়িয়ে পড়ে দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও। নারী উদ্যোক্তা হিসেবে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি জাতীয়ভাবে পুরস্কৃত হন। ফাতেমার কারখানায় কর্মসংস্থান হয়েছিল এলাকার প্রায় দুই শতাধিক নারী-পুরুষ ও স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীর।
সাফল্যের এই জয়যাত্রা থমকে যায় বৈশ্বিক মহামারি করোনা এবং পরবর্তী সময়ে দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে। উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য বাজারমূল্য না পাওয়া এবং কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় ধীরে ধীরে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন এই সফল উদ্যোক্তা। পুঁজি সংকটে নতুন মেশিন কেনা তো দূরের কথা, দৈনিক উৎপাদন বজায় রাখাই দায় হয়ে পড়ে তার জন্য। কারখানার বর্তমান মালিক আবু সায়েম পান্না জানান, ঋণের বোঝা সইতে না পেরে শেষ পর্যন্ত নিজের তিল তিল করে গড়া ফ্যাক্টরি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন ফাতেমা। এরপর স্বামী ও পরিবারসহ তিনি গ্রাম ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যান।
এক সময় যার হাত ধরে ঠাকুরগাঁওয়ের সীমান্তবর্তী গ্রামে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছিল, শত শত পরিবার আয়ের পথ খুঁজে পেয়েছিল, সেই ফাতেমা আজ দেনার দায়ে ফেরারি। ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলের সেই ‘অসাধারণ’ ফাতেমা কি আবারও ফিরে আসবেন নতুন কোনো স্বপ্ন নিয়ে? এই প্রশ্ন এখন ওই এলাকার শত শত শ্রমিকের মুখে মুখে।
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com