শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

“আমার আগুনমেয়ে হওয়ার গল্প, শুরু হয় এক আগুনমায়ের কাছ থেকে”

নুসরাত জাহান আনিকা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়:   |   রবিবার, ১১ মে ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   ৯৮৬ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

“আমার আগুনমেয়ে হওয়ার গল্প, শুরু হয় এক আগুনমায়ের কাছ থেকে”
৪৩

আমি কখনোই বিশেষ দিবস উদযাপনের পক্ষপাতী ছিলাম না। ভালোবাসা তো প্রতিদিনের বিষয়, একটা দিনেই তা বেঁধে রাখা যায় না—এটাই ছিল বিশ্বাস। কিন্তু সময় শিখিয়েছে, জীবনের গতি এতটাই দ্রুত যে, সব সময় মনের কথাগুলো বলা হয়ে ওঠে না।

তাই আজ—মা দিবসে—আমি থামি, ভাবি, আর মন খুলে বলি : শুভ মা দিবস আম্মু।

এই শুভেচ্ছা শুধু একজন মা হিসেবে নয়, একজন লড়াকু, দৃঢ়চেতা, সহনশীল নারীর জন্য।
তুমি রান্নাঘরের গণ্ডির বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলে আমার জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী অনুপ্রেরণা।
তোমার ধৈর্য, সামর্থ্য, সহানুভূতি আর আত্মত্যাগ—এসব কিছু আমি দেখেছি খুব কাছ থেকে।
তুমি ঘর সামলাও, কাজ সামলাও, সম্পর্ক রক্ষা করো—আর সঙ্গে সামলাও দুজন বেয়াদব বাচ্চা, আমার আর শুভ্রর মতো!

তুমি ছিলে আমার একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়, বিশেষ করে আব্বু চলে যাওয়ার পর। তার ভালোবাসা ছিল সীমাহীন, আর তার হারানো মানে ছিল আমার দুনিয়ার রঙ ফিকে হয়ে যাওয়া। যে মানুষটা আমার প্রতিটি জেদ মেনে নিত, আমার ভুলে চোখ না রেখে বলত—‘আমার মেয়ে ঠিক আছে’। তার অভাব পূরণ করেছে তুমি, আম্মু। নিজের কষ্ট চেপে রেখে আমাকে শক্ত হতে শিখিয়েছো। আমার স্বপ্নকে পাখা দিয়ে বলেছো, “করো, আমি আছি!”

তোমার দেওয়া এই সাহস, এই ভালোবাসা, এই নির্ভরতা আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে বারবার।
তুমি আমার সবচেয়ে বড় cheerleader, সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু। তোমার কাছে আমি যা বলতে পারি, পৃথিবীর কারো সাথেই তা পারি না।
তোমার চোখে আমি কখনো judged হই না—বরং পাই সাহস।

আমি জানি না, এত শক্তি তোমার কোথা থেকে আসে। মানুষের এত ক্লেশকর কথা, এত চাহিদা সামলে তুমি সবসময় আমাকে প্রাধান্য দিয়েছো।
আমার ইচ্ছেগুলোকে শ্রদ্ধা করেছো, আমার হতাশার মুহূর্তে আমাকে জাগিয়ে তুলেছো বারবার।

জুলাই মাসের গরম, চারদিকে উত্তাল জনতার স্লোগান। আন্দোলনে উত্তাল পুরো দেশ। আমিও অস্থির, হৃদয়ে জ্বলছে একটাই আকাঙ্ক্ষা—ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু আন্দোলনের উত্তাপ যতই বাড়ে, আমার আম্মুর উদ্বেগ ততই গভীর হয়। একটু পরপর ফোন করে জিজ্ঞেস করেন, “কোথায় আছিস? ঠিক আছিস তো?” তার কণ্ঠে ভয় আর ভালোবাসা মিলেমিশে এক হয়ে যায়।

৫ই আগস্টের সকালের আলোয় আমি প্রস্তুত হচ্ছি। জানি, আজকের দিনটা অন্যরকম হতে যাচ্ছে। তবে বাসায় তখন মামনি ছিলেন না, মামা বসে ছিলেন ড্রয়িং রুমে। জানতাম, মামা টের পেলে আমাকে যেতে দিবেন না। অপেক্ষা করছিলাম কখন তিনি একটু ভেতরে যাবেন—সেই ফাঁকেই বের হয়ে যাবো।

হঠাৎ মনটা কেমন করে উঠল। ভাবলাম, আম্মুকে একবার ফোন করি। জানি, বললে কান্নাকাটি করবে, মানা করবে, হয়ত মামাকেও জানাবে। তবুও ফোনটা করলাম। রিং বাজতেই ধরলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, “আমি আন্দোলনে যাচ্ছি আম্মু, দোয়া করো।” ওপাশে এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর ভেসে এলো নিচু স্বরে কান্না।
তবে অদ্ভুতভাবে, আজ তিনি চিৎকার করলেন না, শাসন করলেন না। শুধু কাঁদতে কাঁদতেই বললেন, “তুই যাস না বাবা… তোর কিছু হলে আমি বাঁচবো না। অন্যরা তো আছেই।”

আমি ধীরে ধীরে বললাম, “যারা শহীদ হয়েছেন, তারা তো কারও না কারও সন্তানের মতোই প্রিয় ছিলেন। তবু তাঁরা গেছেন, আমাদের জন্য।”
আমার কথা শুনে আম্মু বোঝার চেষ্টা করলেন। বুঝলেনও। অনেক কষ্টে কাঁদতে কাঁদতেই বললেন, “আল্লাহ তোকে হেফাজত করুক। তুই যেন ফিরে আসিস বিজয়ী হয়ে।”

আজও সেই মুহূর্ত আমার স্মৃতিতে গেঁথে আছে। মায়ের সেই কান্না, সেই দোয়া, সেই নীরব সম্মতি—সবকিছু মিলিয়ে যেন এক অনন্ত সাহসের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে আমার জীবনে। নিশ্চিত মৃত্যুর আশঙ্কা জেনেও যে মা তার সন্তানকে দেশের জন্য বিদায় দিতে পারে, সেই মা-ই তো আসল যোদ্ধা।

আমার মমতাময়ী মা—ভয়কে সাহসে পরিণত করে যিনি আমাকে ছেড়ে দিতে পেরেছিলেন বৃহত্তর সত্যের জন্য। সেই একজন মা, যিনি নিজের চোখের জল দিয়ে আমাকে আশীর্বাদ করেছিলেন।

আজ মা দিবসে আমি শুধু বলি—ধন্য আমি, এমন মা পেয়ে। তোমার হাতে যেন আল্লাহ্‌ আরও সময় দেন, আরও স্বপ্ন দেন। আর আমার জীবনের সব অর্জনে তুমি থেকো—কারণ, সেই গল্পের শুরু যে তোমার থেকেই।

শুভ মা দিবস, আমার আগুনমা।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us

ফলো করুন bangladoinik.com-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
ফখরুল ইসলাম
সহসম্পাদক
মো: মাজহারুল ইসলাম
Address

জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com