এস এম নওশের: | বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | ৬৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরের কোন এক সময়।আমি তখন ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে।আর্মি এডমিন্সট্রেশন ভীষন কড়াকড়ি। সায়েন্সে পড়ার চাপের পাশা পাশি এখানের ধমকা ধমকি–
এই তোমার চুল বড় কেন? জুতায় কালি নেই কেন? ড্রেস ময়লা কেন?শার্ট ইন করনি কেন?মাথায় ক্যাপ দিয়েছ কেন? শেভ করে আসোনি কেন? এসব নানা বিধ কড়াকড়িতে জীবন যৌবন তেজপাতা
একদিকে প্রশাসনের অতিরিক্ত কড়াকটি অন্যদিকে স্যার দের লেকচার না বুঝতে পারা গোবেচারা আমির জন্যে এক ঝলক দখিনা বাতাসের মত স্বস্তি ছিল ইংরেজি ক্লাস।
কারন যিনি পড়াতেন তিনি একজন ঢাবি থেকে সদ্য পাশ করা তরুন।পড়াতেন চমৎকার। তার মাধ্যমেই পড়লাম আমাদের পাঠ্য উইলিয়াম সমারসেট মমের বিখ্যাত ছোট রম্য গল্প লাঞ্চিউন।যিনি পড়াতেন তার নাম টা এত বছর পরেও বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায় নি। যদিও উনি আমাদের পার্মানেন্ট টিচার ছিলেন না।বদলি টিচার ছিলেন।দরাজ কন্ঠ। গম ফম করত তার লেকচার।
এনামুল হক।
যেখানে আমি নিজের ছেলেদের নাম ই মনে রাখতে পারিনা। প্রায় ই উলটা পালটা লেগে যায় সেখানে একজন বদলি টিচার যিনি পড়িয়েছেন মাত্র দেড় কি দু মাস তার নাম কী করে এত বছর পরেও মনে রাখতে পারলাম নিজেই অবাক হয়ে যাই।
স্যার পুরো গল্প টা পড়িয়েছেন সপ্তাহ ধরে।একবারে অভিনয় করে করে।ফলে একদিকে গল্পটা যেমন মাথায় রয়ে গেল তেমনি গল্প লেখক নিয়েও আগ্রহ তইরি হল। খুজলাম উনার বই পাওয়া যায় কিনা।
নাহ কোত্থাও নেই। পাঁচ বছর শেষ অবধি মিলল ফুটপাতে। দ্য পেইন্টেড ভেইল। তাও পাতা ছেড়া।অইটাই নিয়ে এলাম মাত্র ৫ টাকা দিয়ে।এর কয়েক বছর পর আজিজে পেলাম দ্য মুন এন্ড দ্য সিক্স পেন্স।।সম্প্রতি গত বছর পড়লাম দ্যা মেজিশিয়ান আর ফ্যা রেজর্স এজ। উনার লেখার চাইতে ব্যাক্তিগত জীবনে সমকামি এই লেখকের জীবন ও কম বিস্ময়কর নয়। ভাবলাম তাকে নিয়েই কিছু লিখি। এখানে একটু বলি এনার একটা গল্পের আমার অনুবাদ ২০১৪ তে মাসিক রহস্য পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল
উইলিয়াম সমারসেট মম—একজন মানুষ, যিনি জীবনের নিষ্ঠুর সত্যকে কখনো সাজাননি, আবার অকারণ কুৎসিতও করেননি। তিনি দেখেছেন মানুষকে খুব কাছ থেকে—ডাক্তার হিসেবে, ভ্রমণকারী হিসেবে, আর সর্বোপরি নীরব পর্যবেক্ষক হিসেবে। তাই তাঁর লেখায় প্রেম আছে, কিন্তু রোমান্টিক ভান নেই; নৈতিকতা আছে, কিন্তু উপদেশ নেই; ট্র্যাজেডি আছে, কিন্তু আহাজারি নেই।
মম বিশ্বাস করতেন, মানুষ মূলত স্বার্থপর, ভয়গ্রস্ত এবং একা। আর এই একাকীত্বই তাকে প্রেমে ঠেলে দেয়, ক্ষমতায় টানে, আবার বিশ্বাসঘাতকতাতেও নামায়। Of Human Bondage-এ ফিলিপ কেরির মতো চরিত্ররা আমাদের শেখায়—ভালোবাসা সবসময় মুক্তি দেয় না, কখনো কখনো শিকলও পরায়। The Moon and Sixpence-এ চার্লস স্ট্রিকল্যান্ড আমাদের মুখে চপেটাঘাত করে মনে করিয়ে দেয়—প্রতিভা আর নৈতিকতা এক জিনিস নয়।
সমারসেট মমের গদ্য ঝরঝরে, প্রায় নিরাসক্ত। তিনি চরিত্রদের বিচার করেন না; শুধু আলো জ্বালিয়ে দেন, যেন পাঠক নিজেই দেখে নেয়—কে কেমন। তাঁর সবচেয়ে বড় সাহস ছিল এই স্বীকারোক্তি:
মানুষ মহান হওয়ার চেয়ে সত্য হওয়ার চেষ্টা কমই করে।
তিনি জীবনের গ্ল্যামার ভেঙেছেন। উপনিবেশ, সভ্যতা, চারিত্রিক ভদ্রতা—সবকিছুর নিচে যে আদিম লোভ, ঈর্ষা আর ভয় লুকিয়ে থাকে, সেটাকে খুব শান্ত কণ্ঠে তুলে ধরেছেন। তাই মম পড়তে গিয়ে অস্বস্তি হয়—কারণ তিনি আমাদের মুখোমুখি করান আমাদেরই সঙ্গে।
শেষে, সমারসেট মমকে নিয়ে একটি কবিতা—
সমারসেট মম
তিনি চিৎকার করেননি কখনো,
শুধু বাতি জ্বালিয়েছিলেন—
আলোয় দেখা গেল
মানুষ খুব সাধারণ,
আর সেই সাধারণতাই ভয়ংকর।
ভালোবাসা তাঁর কাছে
ফুল নয়—
একটা অভ্যাস,
যা ছাড়তে পারলে মুক্তি,
না পারলে দাসত্ব।
তিনি বললেন না—“ভালো হও”,
বললেন—“দেখো, তুমি কী”
আর আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে
চলে গেলেন নীরবে।
তারপরও,
আমরা তাঁকে পড়ি—
কারণ মিথ্যার গল্পে শান্তি পেলেও
সত্যের গল্পেই
নিজেকে চিনে নেওয়া যায়।
লেখক কলামিস্ট বিশ্লেষক
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com