সানজিদা লিমু | বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৪ | প্রিন্ট | ৫২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ভেটেরিনারি অনুষদের মাইক্রোবায়োলজি এন্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল ইসলাম এবং তার গবেষক দল মিলে স্বল্পমূল্যে গবাদিপশুর রোগ ব্রুসেলোসিসের ভ্যাকসিন উদ্ভাবন করেছে।

মাইক্রোবায়োলজি ও হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোছা. মিনারা খাতুন, গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের পোল্ট্রি বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. জামিনুর রহমান বাকৃবির স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী মো. রাইসুল ইসলাম, স্নাতকের শিক্ষার্থী নাহিদুজ্জামান এবং অর্ণব সাহা ওই গবেষণা দলের সাথে যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ একাডেমি অফ সাইন্সেস – ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অফ এগ্রিকালচার (বিএএস – ইউএসডিএ) এর অর্থায়নে ২০২০-২৩ এই সময়ে গবেষণাটি সম্পন্ন হয়।
ব্রুসেলোসিস রোগ সম্পর্কে অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ব্রুসেলোসিসে আক্রান্ত গরু, ছাগল, ভেড়া যদি গর্ভধারণ করে তখন তাদের গর্ভপাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। গর্ভপাতটি গর্ভাবস্থায় ৬ মাস থাকাকালীন সময়ে হয়ে থাকে ফলে খামারি একইসাথে গাভী ও বাছুর দুটোই হারায় এবং গাভীর দুধের উৎপাদন ক্ষমতা কমে যায় এবং এতে করে খামারি বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও ব্রুসেলোসিস অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি রোগ, যা ব্রুসেলা ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে ঘটে থাকে। দেশের প্রায় ৫-৬ শতাংশ গবাদিপশু এ রোগে আক্রান্ত হতে দেখা যায়।এতে পশু মারা না গেলেও প্রচুর অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হয়।
ব্রুসেলোসিসের গুরুত্ব নিয়ে অধ্যাপক আরিফ আরও বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জুনোটিক রোগের (প্রাণীর থেকে মানুষে ছড়ায়) ক্ষেত্রে বোভাইন যক্ষ্মার পরই ব্রুসেলোসিসের অবস্থান। সাধারনত পশু চিকিৎসক এবং খামারিরা এ রোগে বেশি আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অজ্ঞতাবশত মাস্ক, গ্লাভস ছাড়া ব্রুসেলোসিসে আক্রান্ত প্রাণীর বাছুর বের করতে গেলে অথবা পরিষ্কার করতে গেলে মানবদেহে রোগটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। মানুষ ব্রুসেলায় আক্রান্ত হলে তার কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া সহ নানা সমস্যা দেখা যায় এবং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ যা সহজেই সারতে চায় না।
অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল হক এ সময় ভ্যাকসিন তৈরির উদ্দেশ্যে নিয়ে বলেন বলেন,এ ভ্যাকসিন টি তৈরির উদ্দেশ্য হলো প্রতিটি ভৌগোলিক অবস্থা বিবেচনায় অনুজীবের আচার-আচরণে পার্থক্য দেখা যায় যার ফলে ভ্যাকসিনের কার্যক্ষমতার ক্ষেত্রেও ও পার্থক্য তৈরি হয়। তাই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্থানীয় জীবাণু নিয়ে গবেষণা করে ভ্যাকসিন টি তৈরি করা হয়েছে।ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন ফর অ্যানিমেল হেলথের (ডব্লিউওএএইচ) নির্দেশনা মোতাবেক ব্রুসেলোসিসে আক্রান্ত প্রাণীকে হত্যা করে তাকে পুঁতে ফেলতে হয় অথবা ইনসিনারেশন (পুড়িয়ে ফেলা) করে ফেলতে হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই নির্দেশনা মানা হলেও বাংলাদেশে তা মানা খুবই কষ্টকর কেননা বাংলাদেশে এর ব্যবস্থা থাকলেও প্রয়োগ নেই বললেই চলে। তাই বিদেশি অনেক ভ্যাকসিন থাকলেও আমরা এই ভ্যাকসিন তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছিলাম।এটি তৈরির আরও একটি উদ্দেশ্য হলো করে কমমূল্যে খামারিদের ভ্যাকসিন সরবরাহ করা।
গবেষণা পদ্ধতি নিয়ে অধ্যাপক বলেন, ক্লিনিক্যাল ও ফিল্ড ট্রায়ালের মাধ্যমে আমদের ভ্যাকসিনটি তৈরি করা হয়েছে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে আমরা ল্যাবে প্রাণীতে (সাদা ইঁদুর) ভ্যাকসিন টি প্রয়োগ করে দেখেছি। ইঁদুরগুলোকে ভ্যাকসিন এবং কন্ট্রোল এই দুই গ্রুপে ভাগ করা হয়। ভ্যাকসিন গ্রুপে ইঁদুরগুলোকে ভ্যাকসিন দেয়া দেয়া হয় কিন্তু কন্ট্রোলে রাখা হয়নি, এরপর আমাদের নিজের শনাক্ত করা ব্রুসেলা জীবাণু দিয়ে এদের নিয়মিত সংক্রমিত করা হয় এবং পরবর্তীতে বুস্টার ডোজ দিয়ে আবার সংক্রমিত করে দেখতে পাওয়া যায় ভ্যাকসিন গ্রুপে রোগের লক্ষণ তৈরি হয় নি কিন্তু কন্ট্রোল গ্রুপে হয়েছে। অর্থাৎ ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। তারপর ফিল্ডে ট্রায়াল দেওয়ার জন্য ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও টাঙ্গাইলের প্রায় ৪০০ গাভীর দেহে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করি এবং পরবর্তীতে ওই গাভীগুলোর এন্টিবডি টেস্ট করে বুঝতে পারি ব্রুসেলোসিসের বিরুদ্ধে উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন টি যথেষ্ট কার্যকর।
ভ্যাকসিন সম্পর্কে অধ্যাপক আরিফুল আরও জানান, বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ব্রুসেলা অ্যাবোরটাস’ (Brucella abortus) এর আধিক্য বেশি। ব্রুসেলা অ্যাবোরটাস’র বায়োভার-৩ এর বিরুদ্ধে উদ্ভাবিত ভ্যাকসিনটি সবচেয়ে বেশি কার্যকর দেখা গিয়েছে ।তবে অ্যান্টিজেন মিল থাকার কারণে অন্যান্য বায়োভারের বিরুদ্ধেও এই ভ্যাকসিন প্রতিরক্ষা দিবে। আমাদের উদ্ভাবিত ভ্যাকসিনটি মৃত ভ্যাকসিনের। প্রতি ছয়মাস অন্তর অন্তর ভ্যাকসিনটির বুস্টার ডোজ দিতে হবে।
অধ্যাপক আরিফুল জানান, ভ্যাকসিন দুই ধরনের হয়ে থাকে জীবিত ভ্যাকসিন এবং মৃত ভ্যাকসিন। জীবিত ভ্যাকসিনে অনুজীবটি জীবিত ও দুর্বল থাকে কিন্ত মৃত ভ্যাকসিনে অণুজীবটি মৃত থাকে কিন্তু এন্টিবডি বিদ্যমান থাকে। জীবিত ভ্যাকসিনের অসংখ্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে যেমন: ভ্যাকসিন দেয়ার সময় ইনজেকশনের সুঁচ ঠিকমতো না ফুটলে ওই জীবিত ব্যাকটেরিয়া মানুষ ও অন্য পশুর সংস্পর্শে এসে রোগ সৃষ্টি করতে পারে, গর্ভপাত করতে পারে, জীবিত ভ্যাকসিন সংরক্ষণের জন্য কোল্ড চেইন দরকার পরে।কিন্তু আমাদের ভ্যাকসিনটি মৃত হওয়ায় অই ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পাওয়ার সম্ভাবনা নেই এবং এক বছর ধরে চলা ফিল্ড ট্রায়ালে কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
খরচের বিষয়ে অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল ইসলাম আরও বলেন, ভ্যাকসিনের ফর্মুলা তৈরি আছে তবে বাণিজ্যিক ভাবে উৎপাদন করা এখনো সম্ভব হয়নি। তবে পর্যাপ্ত ফান্ডিং এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এর বাণিজ্যিক উৎপাদন এর সম্ভাবনা আছে। এছাড়াও কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চাইলে আমরা ভ্যাকসিনটি তৈরি করে তাদের সরবরাহ দিতে পারবো।
একটি গবাদি পশুর ভ্যাকসিনের জন্য খরচ হবে মাত্র ৫০ থেকে ১০০ টাকা।বুস্টার ডোজের জন্যও একই খরচ পড়বে। উৎপাদন খরচ, সস্তা কাঁচামাল ও প্রযুক্তিগত বিষয়ে খরচ কম হওয়ায় এতো অল্প মূল্যে ভ্যাকসিনটি সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। উল্লেখ্য, অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল হক ও তার গবেষকদল ২০১৬ সালে সর্বপ্রথম দেশে গবাদিপশুর দেহে ব্রুসেলার উপস্থিতি টের পেয়েছিলেন।
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com