শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

ভুট্টো সাহেবের গোপন প্রেম: এক বাঙালি নারীর কাহিনি

এস এম নওশের:   |   বৃহস্পতিবার, ১২ জুন ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   ১৮৩ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

ভুট্টো সাহেবের গোপন প্রেম: এক বাঙালি নারীর কাহিনি
১২

পাকিস্তান ভাঙার জন্য যদি মাত্র একজন মানুষকে দায়ী করতে হয়, তবে চোখ বন্ধ করেই বলব—তিনি আর কেউ নন, মি. জুলফিকার আলি ভুট্টো। বর্তমান পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট মি. আসিফ আলি জারদারির শ্বশুর মশাই—এই লোকটিই ইতিহাসের রক্তাক্ত নাট্যমঞ্চে এক অদ্ভুত চরিত্র। এবং আজ যে কাহিনি বলব, তা শুনলে আপনারা হয়ত চা’য়ের কাপ হাতে চমকে উঠবেন—”কি বলেন সাহেব!”—আমি নিজেও চমকে গিয়েছিলাম, যখন জানলাম ভুট্টোর শেষ স্ত্রী ছিলেন এক বাঙালি নারী।

হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। নাম ছিল হুসনা আহাদ। ঢাকা সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল আহাদের স্ত্রী ছিলেন। বুদ্ধিমতী, ব্যক্তিত্বময়ী, শ্যামবর্ণা, কিছুটা এক হারা হারা গড়নের—তবে রীতিমতো তীক্ষ্ণধী। সিনেমার নায়িকা মার্কা সৌন্দর্য নয়, ওনার আকর্ষণ ছিল কথায়, ভাবনায়, ব্যাক্তিত্বে আর সেই চোখে—যেখানে যুক্তি আর রসবোধ দুটোই খেলা করত।

১৯৬১ সালে ভুট্টোর সঙ্গে হুসনার পরিচয়। তারপর ধীরে ধীরে গড়ায় সেই সম্পর্ক, যা কবিরা বলেন—”অবধারিত পতনের দিকে এগিয়ে চলা এক অনিবার্য প্রেম।” তখন ভুট্টো ছিলেন পাকিস্তানের ভবিষ্যতের এক রাজনৈতিক তারকা, হুসনা এক বিবাহিত নারী। সম্পর্ক বাড়তে বাড়তে ১৯৬৫ নাগাদ হুসনার বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়। তারপর করাচি। দুই সন্তানকে নিয়ে এক নতুন জীবন। এবং সেই জীবন সাজাতে ভুট্টো তাঁকে উপহার দেন এক বিশাল ভিলা—যেখানে থাকেন বই, আলো, আর হুসনার মতো এক অনিন্দ্য নারী।

ভুট্টো তখন দুটো বিয়ে করে ফেলেছেন। প্রথমজন ছিলেন আত্মীয়া, যাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল কিছুটা নরেন্দ্র মোদীর স্ত্রীর মতো—আছেন, আবার নেই। দ্বিতীয়জন—নুসরৎ ইস্পাহানি, পরবর্তী তে নুসরত ভুট্টো এক ধনী উগ্র সুন্দরি স্মার্ট কুর্দি রমনী, যাঁর গর্ভে জন্ম নেয় চার সন্তান, যার মধ্যে একমাত্র কন্যা হলেন আমাদের চেনা বেনজির ভুট্টো। পাকিস্তানের দুবারের প্রধান মন্ত্রী। বর্তমান প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির মরহুম বেগম সাহেবা।

তবুও, হুসনা ছিলেন ভিন্ন মাপের মানুষ। পড়ুয়া, বিদুষী, এক কথায়—সতীনদের দল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা প্রজাতির। ভুট্টো বিদেশ থেকে যা এনে দিতেন—দামী গয়নাগাটি নয়, বরং বই। আর হুসনা সে বই পড়ে শেষ করতেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, যেন পরেরবার ভুট্টো আসলেই বই নিয়ে আলোচনা করা যায়। প্রেম তো তখনো ছিল, কিন্তু তার গভীরতা ছিল কথায়, চিন্তায়, তর্কে—খাঁটি সেমিনার-মার্কা রোমান্স। ইংরেজিতে একটা শব্দ আছে
স্যাপিও সেক্সুয়াল।হুসনা আর জুলফির সম্পর্ক টা আমার কাছে মনে হয় অই রকমই কিছু ছিল।

১৯৬৯ থেকে ৭১ সালের মাঝামাঝি কোনও এক গোপন সময়, পার্টির এক মওলানাকে ডেকে—হয়তো নিঃশব্দে, হয়তো রাতের অন্ধকারে—তাদের নিকাহ সম্পন্ন হয়। সেই নিকাহনামা ভুট্টোর ফাঁসির পরে রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে যায়। দোষ দেব কাকে? ইতিহাস? পরিবারের প্রটোকল? না কি পুরুষতান্ত্রিক ভণ্ডামি?

হুসনার আরেক পরিচয় ছিল ইন্টেরিয়র ডিজাইনার হিসেবে। এমনকি তিনি আরব আমিরাতের এক আমিরের স্ত্রীর প্রাসাদও ডিজাইন করেছিলেন—যিনি এখনকার আমিরের মা। ভাবুন, বাঙালি নারী লাল কাপড়ে ঢাকা এক শ্যামা মূর্তি হয়ে বসে আছেন আরবের রাজপ্রাসাদ সাজাতে!

ভুট্টোর পতনের পর, ১৯৭৭ সালে, হুসনা চলে যান লন্ডনে। তখনকার সামরিক শাসক জিয়াউল হক—যাকে ভুট্টো আদর করে ডাকতেন “My Monkey General”—তাঁকে ফাঁসির আদেশ দেন। হুসনা চেষ্টা করেন স্বামীকে বাঁচাতে। লন্ডন থেকে বিখ্যাত আইনজীবী নিয়োগ করেন, এমনকি আরব আমিরদের কাছেও দেন দরবার করেন। কিন্তু ততদিনে ইতিহাস অন্য পাণ্ডুলিপি লিখে ফেলেছে।

হুসনার সেই করাচীর ভিলা আর আলবার্ট হলের কাছে লন্ডনের বাড়িতে আজও, শোনা যায়, ভুট্টোর একটি বিশাল ছবি টানানো আছে। সেই ঘরেই জন্ম নেয় ভুট্টোর আরেক সন্তান—যার স্বীকৃতি ভুট্টো পরিবার স্বাভাবিকভাবেই দেয়নি। এখন, নব্বইয়ের কোটায় হুসনা ভুট্টো বেঁচে আছেন, নিঃশব্দে, ইতিহাসের এক গোপন অধ্যায় হয়ে।

বলুন তো, এমন প্রেমকাহিনি—যেখানে আছে রাজনীতি, পরকীয়া, পাকিস্তান, প্রাসাদ, প্রপাগান্ডা—আর বাঙালিয়ানার লাবণ্য—তার নাম কি আমরা দিতে পারি?
আমি তো ভাবছি, নাম দিই: “ম্যাডাম হুসনা ও হুজুর ভুট্টো: একটি অসমাপ্ত উপাখ্যান”।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us

ফলো করুন bangladoinik.com-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
ফখরুল ইসলাম
সহসম্পাদক
মো: মাজহারুল ইসলাম
Address

জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com