নিজস্ব প্রতিবেদক | শনিবার, ১০ মে ২০২৫ | প্রিন্ট | ৩৫৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আজ যেন রূপ নিয়েছিল এক ঐতিহাসিক মিলনমেলায়। সেখানকার আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হচ্ছিল শ্লোগানে, ‘হানিফ ভাইকে স্বাগতম’, ‘সত্যের বিজয় হলো’ ইত্যাদি ব্যানার-প্ল্যাকার্ডে। দীর্ঘ ১৫ বছরের প্রবাস জীবন শেষে আজ দেশে ফিরেছেন দেশের অন্যতম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সফল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হানিফ।
তার প্রত্যাবর্তন ঘিরে উত্তেজনা, আবেগ ও জনতার ঢল রাজধানীর রাজপথে নতুন এক ইতিহাস তৈরি করল। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার জনসভায় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে।
সেই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় অনেক ওঠানামার পর হঠাৎ করেই যুক্ত করা হয় মোহাম্মদ হানিফের নাম—যিনি তখন বিএনপি ঘনিষ্ঠ একজন শিল্পপতি ও উদীয়মান রাজনৈতিক নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিচার বিশ্লেষকদের মতে, মামলার মূল এজাহারে তার নাম ছিল না। এমনকি রাষ্ট্রপক্ষের ১৬১ ধারায় গৃহীত ৪০৮ জন সাক্ষীর জবানবন্দিতেও তার নাম উঠে আসেনি।
কোনো আসামির ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিতে ছিল না তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ। শুধু মুফতি হান্নানের একটি বিতর্কিত স্বীকারোক্তিতে চারটি বাক্যে হানিফের নাম উল্লেখ করা হয়, যেটির ওপর ভিত্তি করেই তাকে আসামি করা হয়। এমন অপ্রমাণিত ভিত্তিতে দেওয়া হয় মৃত্যুদণ্ড—যা দেশের আইনি ও রাজনৈতিক মহলে বিস্ময় ও সমালোচনার জন্ম দেয়।
রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন এবং প্রাণনাশের আশঙ্কায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হন মোহাম্মদ হানিফ। তার বিরুদ্ধে চলতে থাকে মিডিয়া ট্রায়াল, রাজনৈতিক অপপ্রচার ও সামাজিক নিঃসরণ। এ সময় পরিবার হারানোর বেদনা তাকে নিঃশেষ করে দেয়। ২০২০ সালে তার পিতা, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সড়ক পরিবহন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ‘হানিফ পরিবহন’-এর প্রতিষ্ঠাতা জয়নাল আবেদিন মারা যান। পিতার মৃত্যুর মাত্র ১৩ দিন পর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তার মা।
কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হানিফ তাদের জানাজায় উপস্থিত হতে পারেননি। মোহাম্মদ হানিফ শুধু রাজনৈতিক পরিচয়েই নয়, একজন দূরদর্শী উদ্যোক্তা হিসেবেও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় ছিলেন। তার বাবা জয়নাল আবেদিন তার নামে ‘হানিফ পরিবহন’ প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রতিষ্ঠানটি দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও উন্নত সেবার মাধ্যমে দেশের পরিবহন খাতে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করে। হানিফের ব্যবসায়িক সাফল্য ও জনপ্রিয়তা তাকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক অঙ্গনের শক্তিশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। বিএনপির অনেক নেতাই তাকে দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব হিসেবে বিবেচনা করতেন। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে জয় লাভ করে আওয়ামী লীগ।
এরপর বিএনপিকে দুর্বল করে রাজনীতিতে একক আধিপত্য কায়েমের প্রয়াসে দলটির নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে নেয়া হয় নানা দমনমূলক পদক্ষেপ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই কৌশলের অংশ হিসেবেই মোহাম্মদ হানিফকে পরিকল্পিতভাবে মামলায় জড়ানো হয়। তার জনপ্রিয়তা ও প্রভাব ভেঙে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে বিচারের নামে সাজা দেওয়া হয়।
এমন বিচারিক প্রহসনে হতবাক হন দেশের বিশিষ্টজনেরা। সম্প্রতি দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে হানিফসহ মামলার সব আসামি খালাস পান। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে মামলায় তাকে জড়ানোর কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তার খালাসে দেশব্যাপী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন রাজনীতি সচেতন জনগণ। তবে আইনিভাবে তিনি মুক্ত হলেও, ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে তিনি যে আঘাত পেয়েছেন তার ক্ষত সহজে মোচনযোগ্য নয়।
আজ সকালে ঢাকায় তার পা রাখার মুহূর্তেই বিমানবন্দর থেকে শুরু করে আমিনবাজার-গাবতলি পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছিলো উৎসবমুখর পরিবেশ। গান-বাজনা, ফুলেল শুভেচ্ছা, জয়ধ্বনি আর নেতাকর্মীদের উচ্ছ্বাসে যেন ঈদের আমেজ। বিএনপির সিনিয়র নেতারা তাকে বরণ করে নেন সম্মান ও আবেগে।
এক নেতার ভাষায়, “এটি শুধু একটি প্রত্যাবর্তন নয়, এটি সত্য ও ন্যায়ের বিজয়ের মুহূর্ত।” রাজনীতির এই প্রবাদপুরুষ নিজের এলাকাবাসীর কাছে আশার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। অনেকেই আশা করছেন, হানিফ আবার রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন।
যদিও তিনি আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেননি, তবে ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, দেশের সেবা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তিনি আবার মাঠে নামতে প্রস্তুত। প্রবাদে আছে, “জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী”—মা ও মাতৃভূমি স্বর্গের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। সেই চেতনাতেই আজ দেশে ফিরেছেন মোহাম্মদ হানিফ। তার প্রত্যাবর্তন শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক পুনর্জাগরণের সূচনা। অপমান, কষ্ট ও অবিচারের দীর্ঘ রাত পেরিয়ে আজ তার জীবনে নতুন ভোর।
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com