এস এম নওশের চিকিৎসক | বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৪ | প্রিন্ট | ৭৬ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
চা এখন বাংগালির এমন এক পানীয় যা দেশের টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া সুন্দরবন থেকে বান্দরবান সব খানেই পান করা হয়।অথচ এক সময় এই বাংগালি ছিল চা বিমুখ।এদের চা য়ে অভ্যস্ত করতে ইংরেজ দের কত কসরত করতে হয়েছে। এখন তো চা আমাদের রক্তের সাথে এমন ভাবেই মিশে গেছে যেন সেটা না খাইতে পারলে শরীরে জুত লাগেনা।
আমাদের সব বীরত্ব চায়ের আড্ডায়। বাংগালি চায়ের আড্ডায় দেশ জাতি উদ্ধার করে।আমার আগের বিভাগে আমাদের নিজস্ব চায়ের ইলেক্ট্রিক কেটলি ছিল।কতৃপক্ষের নিষেধ থাকা সত্বেও আমরা চা বানিয়ে খেতাম। আমাদের চিনি চা পাতা আদা লেবু মজুত থাকত।চিনি না থাকলে আমার চিনি ছাড়াও আপত্তি ছিল না।আসতেন পাশের ডিপার্টমেন্ট এর সিরাজ ভাই।
এসেই হাক দিতেন কী ব্যাপার আজ আপনাদের রুম থেকে চায়ের গন্ধ পাই না কেন।ভীষন রসিক মানুষ ছিলেন।আসতেন হাসপাতালের চীফ ইঞ্জিনিয়ার মাসুদ ভাই কী ভাই আইজ কা আপনেরা চা চু খান নাই?? আরে না না বসেন। চা এর সাথে টা ও আনানো হত। সেই সাথে চলত আড্ডা।উনি ভীষন হাসাতে পারতেন।আমাদের চা এর জন্য্ আলাদা চাদা ধরা থাকত।আমরা সবাই কে চা খাওয়াতাম। আসলে চা খাওয়াটা ছিল উনাদের উপলক্ষ্য। লক্ষ্য ছিল আমাদের সাথে খানিক টা গল্প করে যাওয়া।
এ তো গেল আমার গল্প এবার আসি অন্য গল্পে। ইংরেজ রা যখন দেশিদের চা তে অভ্যস্ত করে ফেলল তখন দেশি এবং বিদেশের বাজারে প্রচুর চা এর চাহিদা দেখা দেয়ায় তারা আসাম পশ্চিম বংগের দার্জিলিং শিলিগুরি এবং পুর্ব বংগের সিলেট শ্রী মংগলে চায়ের চাষ শুরু করল।এর জন্যে দরকার ছিল শ্রমিক।এদের তারা আনল বিহার ইউপি থেকে হত দরিদ্র দের।
এ ছাড়াও স্থানীয় পাহাড়ি আদিবাসীদের কেও তারা যুক্ত করল।খুব অল্প মজুরি তে তাদের এই কাজে বাধ্য করল বংশ পরম্পরায়। আজ ইংরেজ চলে গেছে কত বছর।কিন্তু তাদের মজুরি তেমন বাড়েনি।আমি যখন ডানকানের চা বাগান দেখতে যাই চন্ডি ছরায় তখন শুনেছিলাম এদের মজুরি ছিল দৈনিক ৮৫ টাকা।চা শ্রমিকেরা আন্দলন করেছিল তাদের দৈনিক মজুরি ন্যুনতম ৩০০ টাকা করতে। সেটাও মালিক পক্ষ মানেনি। তাদের এখন মজুরি দৈনিক ১৪৫ টাকা।
চা গাছে কিন্তু পুরো গাছের পাতা কে চা পাতা হিসেবে তোলা হয় না।একদম কচি পাতা গুলাকে নেয়া হয়।তারপর সেটা তাদের প্ল্যান্টে নিয়ে শুকিয়ে গুড়ো করা হয়।বড় পাতা গুলা দেখেছি শ্রমিক দের ভর্তা করে ভাত দিয়ে খেতে।শ্রমিকেরা যাতে সেই ভাবে আন্দলনে যেতে না পারে সেই জন্যে ডানকানের বাগানের খুব কাছেই দেখলাম ভাট্টি খানা।
যেখানে দেশী চোলাই।মদ বিক্রি হয়।ছেলে শ্রমিকেরা মজুরি পেয়েই গিয়ে ভাট্টি খানায় ঢুকে।মজুরির বেশির ভাগ টাকাই চলে যায় মদ গিলতে।শ্রমিকদের যাতে খিদে কম পায় এজন্যে বড় মগে করে করে তাদের কড়া চা পান করানো হয় ফ্রি তে। আমি তাদের কুলি লাইনে তাদের মানবেতর জীবন যাত্রা দেখেছি।বাচ্চা জন্ম দিয়েও সেই মা চলে এসেছে কাজে।
কারন নইলে যে সেদিনের মজুরি কাটা।ছোট ছোট পাতার ২৪ কেজি তুলতে পারলে মিলবে দিনের পুরো মজুরি। দার্জিলিং এ বিখ্যাত মাকাইবাড়ি টি এস্টেটে গেছিলাম।সেটা ছিল একটা ট্যুর প্যাকেজ। টয়ট্রেনে দার্জিলিং থেকে কার্সিয়াং আপডাউন সেই সাথে মাকাইবাড়ি টি স্টেট ভ্রমন।সেটাও অভাবনীয় অভিজ্ঞতা।
এর মালিক বাংগালি ব্যানার্জি পরিবার দের এটা চার পুরুষের ব্যবসা। বর্তমানে এর মালিকানা বদল হয়েছে।এদের ব্যাক্তিগত মিয়জিয়ামে দেখলাম শিকার করা বিভিন্ন স্টাফ করা পশু পাখি এবং বড় বড় হরিন মহিষের ট্রফি। তাদের বাগান গুলো উচু পর্বতের ঢালে।কুয়াশায় মোড়ানো।সত্যজিত রায় এর ফেলুদার প্রিয় ছিল এদের চা।
অনেক সাহিত্যিকের লেখাতেও এসেছে এই চা বাগান বিশেষ করে সমরেশ মজুমদার বুদ্ধদেব গুহ প্রমুখ।সমরেশ মজুমদারের বিখ্যাত কালবেলার নকশাল বিপ্লবি অনিমেষ উঠে এসেছিল জল্পাইগুরির এক চা বাগান থেকে।গানেও এসেছে চা বাগান তাই শেষ করলাম ভুপেন হাজারিকার গানের ক টা লাইন দিয়ে একটি কুড়ি দুটি পাতা রতন পুর আংগিনা লছমি আজো তোলে ও লছমি আজো তোলে সবুজ সবুজ বাহারে দুলত দোদুল আহারে
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com