আসাদুজ্জামান তালুকদার | শনিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট | ৫৪৯ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
হাওরের জলরঙ অধ্যায় – ১ : হাওরের সকাল কুসুমডোবা গাঁও। চারদিক পানি-পানি, দিগন্তজোড়া হাওর। ভোরবেলা সূর্য উঠলেই পানির গায়ে লাল আভা খেলে যায়। হাওরের বাতাসে ভিজা মাটির গন্ধ। সাব্বির নাও ঠেলতে ঠেলতে গুনগুন কইতেছিল— “হাওরের পানি মিষ্টি রে, হাওরের বাতাসও মিষ্টি, এইখানেই আমার জন্ম, এইখানেই মরন হইবো নিশ্চি।” ওদিকে মায়া ধানখেতের আল দিয়া যাইতেছিল। চুল খোলা, মুখে লাজুক হাসি। দেখতেহমনি সাব্বির নাও থুইয়া ডাক দিল— “ও মায়া! কই যাইতাছস গো?” মায়া হেসে বলল— “মাটির ঘরডায় যাইতাছি, মা ডাকতেছে।”
অধ্যায় – ২ : স্বপ্নের ডিঙি নাও রাতের খাওয়া শেষে সাব্বির তার মাক লগে কইল— “মা, আমি শহরে গিয়া পড়মু। কিত্তে জানি কষ্ট শেষ কইরা কিছু একটা করমু।” মা মৃদু হেসে বলল— “বাপ, হাওরের টানডা মনে থাইক্কা করবি। বইসা বড় হইলেও বুকের শেকড়ডা হাওরেই।” সেই রাতে মায়ার লগে সাব্বির গোপনে কথা কয়— “মায়া, আমি যদি পড়তে শহরে যাই, তুই বইসা অপেক্ষা করবি তো?” মায়া চুপচাপ, পরে মাথা নিচু কইরা কয়— “তুই কি মনে করস, হাওরের মায়া কাটন যায়? যাইস, কিন্তু আমাগো ভুলিস না।”
অধ্যায় – ৩ : ধান কাটার মৌসুম শীত আইল্যা গাঁও ভরতি ধান। সক্কলে একসাথে খেত থেইক্কা ধান কাটতাছে। মহিলা-পুরুষ গাইতাছে— “ধান কাট রে ভাই, ধান কাট, ধানের গন্ধে মন মাত।” সাব্বির নাওভর্তি ধান নিয়া ফিরতেছিল। মায়া দৌড় দিয়া কইল— “ও সাব্বির! এত ধান বাইলা আনলি?” সাব্বির হাসল— “হাওর যদি রিসা না করে, তহন আমাগো খাওন আছে।” কিন্তু তার চোখে লুকানো দুঃখ, হাওর যেকোনো সময় সব লইয়া যাইতে পারে।
অধ্যায় – ৪ : দুর্ভিক্ষের ছায়া বসন্তে আচমকা বান আইল্যা পড়ল। জমির ধান, ঘরবাড়ি, সব ডুইবা গেল। মায়ার বাবা কইল— “হাওর ভাত দ্যায়, আবার ভাত লইয়া যায় রে। আল্লার দয়া ছাড়া কিছু নাই।” মায়ার মা কয়দিন খালি পেটে ঘুমাইল। সাব্বির কইল— “এইজন্যই বই পড়ন দরকার। যদি না শিখি, আমাগো জীবনডা বানের জলে ভাসা খইরের মতো।”
অধ্যায় – ৫ : হাওরের প্রেম এক সন্ধ্যায় চাঁদের আলো ঝিকমিক করতেছিল। সাব্বির মায়ার হাত ধইরা কয়— “মায়া, আমি যদি দেরি কইরা ফিরি, তুই অন্য কারও হইস না।” মায়ার চোখ ভিজা— “আমার বুকডা হাওরের মতো বড়, কিন্তু তোর ছাড়া ওইখানে কাহারও ঠাই নাই।”
অধ্যায় – ৬ : শহরের পথে সাব্বির সাব্বির শহরে গিয়া পড়তে লাগল। শহরের মানুষ উপহাস করল— “হাওরের ছেলে শহরে টিকবো কেমনে?” কিন্তু সাব্বির বুক চাপড়াইয়া কইল— “আমি যদি না শিখি, আমার মাটি, আমার মানুষরা অন্ধকারেই থাকবো।”
অধ্যায় – ৭ : মায়ার অপেক্ষা হাওরে বসে মায়া রোজ নাওগুলা দেখে। ভাবে—“হয়তো সাব্বির আইতাছে।” তার বাবা কইল— “বেটি, সাব্বির তো শহরে গ্যালা, এখন শহরের হইয়া যাইবো।” মায়া কান্না চাপা দিয়া কয়— “ও হাওরের বুক থেইক্কা জন্ম নিয়া গেছে, কেমনে ছাইড়া যাইবো?”
অধ্যায় – ৮ : প্রতিদ্বন্দ্বী আগমন চেয়ারম্যানের পোলা মায়ার লগে বিয়া করতে চাইল। চেয়ারম্যান মায়ার বাপরে কয়— “আমাগো ঘরে যাইলে অভাব থাকবো না।” মায়া কইল— “আমি সাব্বির ছাড়া আর কারও হইতে পারমু না।” কিন্তু গ্রামের লোকজন গুঞ্জন করতেছিল।
অধ্যায় – ৯ : প্রলয়ের বন্যা আবার বান নামল। গাঁও ভাসি, মানুষ আতঙ্কে। মায়ার ঘরবাড়ি ডুইবা যাইতেছিল। তখন সাব্বির শহর থেইক্কা ছুটে আইল। সে বুক ফাইটা পানিতে নাও বাইরা সবাইরে বাঁচাইল। মায়ার মা কইল— “বাবা সাব্বির, আল্লায় তোকে বরকত দিক, তুই না থাকলে আমরা মাইরা যাইতাম।” মায়া বুক চাপড়াইয়া কাঁদল, সাব্বিরের বুকে মুখ গুঁজল।
অধ্যায় – ১০ : ফিরে আসা বন্যার পর সাব্বির গ্রামে স্থায়ীভাবে ফিরল। সে স্কুল খুলল, চাষিদের নতুন ধানচাষ শিখাইতে লাগল। গ্রামবাসী কইল— “হাওরের ছেলে আবার গাঁয়ে ফিরল, পথ দেখাইব।”
অধ্যায় – ১১ : হাওরের টান শহরে চাকরির ডাক আসছিল, কিন্তু সাব্বির কইল— “শহরে টাকা আছে, কিন্তু হাওরে আমার মাটি। আমি শেকড় ছাইড়া যাইতে পারমু না।” মায়ার চোখে তখন আনন্দের ঝিলিক।
অধ্যায় – ১২ : জলরঙের সমাপ্তি একদিন গাঁওর সক্কলের সামনে সাব্বির মায়ার হাত ধরল— “আজ থেইক্কা আমি আর মায়া একসাথে হাওরের জলরঙ আঁকুম।” গ্রামবাসী তালি দিয়া উঠল— “হাওরের ছেলে হাওরের বউ নিয়া গাঁওত বইসা থাকবো, আমাগো পথ দেখাইবো।” সন্ধ্যার আকাশে লাল আভা পড়ল, হাওরের পানিত সেই রঙ মিশে গেল। মনে হইল—হাওরের বুকেই জন্ম নিল নতুন স্বপ্ন।
লেখক: আসাদুজ্জামান তালুকদার
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com