আনোয়ার হোসেন, | সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
গাইবান্ধা জেলার প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও গত ২৪ ঘণ্টায় প্রতিটি পয়েন্টেই তা বেড়েছে। একইসঙ্গে জেলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। এছাড়া তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ভিটেমাটি ও ফসলি জমি।
সোমবার (২০ জুলাই) বিকেল ৩টার হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী এই চিত্র উঠে এসেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, গড় সমুদ্রপৃষ্ঠের সমতল থেকে পরিমাপকৃত পানির উচ্চতা অনুযায়ী জেলার যমুনা-ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট, করতোয়া ও তিস্তা ৪টি নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জেলার সবচেয়ে বড় নদী যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের ফুলছড়ি পয়েন্টে সোমবার পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ১৮.৭৬ মিটার, যেখানে এই পয়েন্টের বিপৎসীমা ১৯.৩৫ মিটার। অর্থাৎ, পানি বিপৎসীমার ৫৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এখানে পানি বেড়েছে ৯ সেন্টিমিটার, যা পর্যবেক্ষণাধীন পয়েন্টগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধির হারগুলোর একটি।
শহরের পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া ঘাঘট নদীর নিউব্রিজ পয়েন্টে পানির উচ্চতা মাপা হয়েছে ২০.২৮ মিটার। বিপৎসীমা ২১.২৫ মিটার হওয়ায় পানি বিপৎসীমার ৯৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এখানেও গত এক দিনে পানি বেড়েছে ৯ সেন্টিমিটার। জেলা শহরের অভ্যন্তর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ঘাঘটের এই পানি বৃদ্ধির প্রবণতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে বাড়তি সতর্কতা লক্ষ্য করা গেছে।
চার নদীর মধ্যে করতোয়া নদীর চকরহিমাপুর পয়েন্টে বিপৎসীমার সঙ্গে পানির ব্যবধান সবচেয়ে বেশি। বর্তমান পানির উচ্চতা ১৭.৮০ মিটার, বিপৎসীমা ১৯.৭০ মিটার। অর্থাৎ, পানি বিপৎসীমার প্রায় ২ মিটার (১৯০ সেন্টিমিটার) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এখানে পানি বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম, মাত্র ৪ সেন্টিমিটার।
তিস্তা নদীর কাউনিয়া পয়েন্টে সোমবার পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ২৮.৯৭ মিটার, বিপৎসীমা ২৯.৩১ মিটার। এই হিসাবে পানি বিপৎসীমার মাত্র ৩৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যা চার পয়েন্টের মধ্যে বিপৎসীমার সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থান। গত ২৪ ঘণ্টায় এখানে পানি বেড়েছে ৭ সেন্টিমিটার।
পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি জেলায় বৃষ্টিপাতও অব্যাহত রয়েছে। গতকাল ১৯ জুলাই সকাল ৯টা থেকে আজ ২০ জুলাই সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় গাইবান্ধা জেলায় ৪৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। উজানের ঢল ও স্থানীয় বৃষ্টিপাত একসঙ্গে যুক্ত হওয়ায় নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পানি বৃদ্ধির এই ধারার মধ্যেই জেলার তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর তীরজুড়ে অব্যাহত রয়েছে ভাঙন। সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার অন্তত ২৫টি এলাকায় ভিটেমাটি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে প্রায় দুই শতাধিক বসতবাড়ি। ফলে, চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে নদীপাড়ের মানুষেরা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ভাঙন প্রতিরোধে জেলার প্রায় ১৩টি এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় জিও ব্যাগের পরিমাণ কম এবং কাজের গতি ধীর হওয়ায় সেগুলো দ্রুতই নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে। কার্যকর ও দ্রুতগতির ভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, তাদের এলাকার হাজার হাজার বিঘা পাটখেত ভেঙে নদীতে চলে গেছে।
আরেকজন বাসিন্দা জানান, নদীভাঙন দেখে তারা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন-বাড়িঘর সরিয়ে নেবেন, নাকি সহায়-সম্পত্তি রক্ষার চেষ্টা করবেন, তা নিয়ে দ্বিধায় আছেন তারা।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, গাইবান্ধার নদ-নদীগুলোর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে থাকলেও গত এক দিনে প্রতিটি পয়েন্টেই তা বেড়েছে ৪ থেকে ৯ সেন্টিমিটার পর্যন্ত। বিশেষ করে তিস্তা ও যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপৎসীমার তুলনামূলক কাছাকাছি থাকায়, আর একইসঙ্গে তিন নদীর তীরে ভাঙন অব্যাহত থাকায় নদীপাড়ের নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের দুশ্চিন্তা এখন দ্বিগুণ। উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দিনে পানি আরও বাড়ার পাশাপাশি ভাঙনের তীব্রতাও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে। নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকা এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), গাইবান্ধার নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম জানান, জেলার কোনো নদীর পানি এখনো বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। তাই তাৎক্ষণিক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। তবে, উজানে ভারী বৃষ্টিপাত বা পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকলে পানির উচ্চতা আরও বাড়তে পারে। একইসঙ্গে ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং নদীতীরবর্তী ও চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com