আনোয়ার হোসেন | শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৬৭১ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

ভোরের কাঁচা আলো ফোটার আগে কিংবা প্রদীপের টিমটিমে আলোয় যখন চারপাশ নিঝুম, তখন এক গ্রামীণ বধূর কাঁপাকাঁপা হাত দুখানি ব্যস্ত হয়ে উঠত। শাশুড়ি কিংবা ননদের চোখ এড়িয়ে লুকিয়ে লেখা সেই পঙক্তিগুলো কেবল কালির আঁচড় ছিল না; তাতে মেশানো ছিল কাজল ধোয়া চোখের জল। “চিঠি লিখেছে বউ আমার ভাঙ্গা ভাঙ্গা হাতে…” অমর এই গানের পঙক্তিটি আজ কেবল একটি সুর নয়, এটি বাংলার এক গ্রামীণ জনপদের না বলা উপাখ্যান। রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’ গল্পের অমল যেমন জানালার ধারে বসে খবরের অপেক্ষায় থাকত, তেমনি প্রতি রাতে স্টেশনে আসা ঢাকা থেকে শেষ ট্রেনটির শব্দে বুক কেঁপে উঠত এক দূরপ্রবাসীর স্ত্রীর। আজ প্রযুক্তির মোহালয়ে খাম ছোঁয়ার দিন শেষ, কিন্তু না-লেখা চিঠির হাহাকার কি সত্যিই ফুরিয়েছে?
একটা সময় ছিল যখন পিয়নের সাইকেলের ঘণ্টার শব্দ মানেই ছিল বাড়িতে একরাশ আনন্দের তুফান কিংবা চাপা কান্নার রোল। দূরদেশের ঠিকানায় পাঠানো চিঠির ওপর সুচারু অক্ষরে নাম লেখা, খামের মুখে আঠা লাগানোর সে এক অদ্ভুত রোমান্টিকতা ছিল। রবীন্দ্রনাথের যুগে চিঠি ছিল মনের ভাব প্রকাশের একমাত্র মরমী মাধ্যম। হৃদয়ের গভীর কোণ থেকে উঠে আসা কথাগুলো যখন কালির কালচে রঙে সাদা কাগজে প্রাণ পেত, তখন প্রাপক সেই কাগজের ভাঁজে খুঁজে পেত প্রেরকের হাতের উষ্ণ ছোঁয়া। প্রিয় মানুষের সুদূর প্রবাস জীবন আর ঘরের কোণের একলা বধূর মধ্যের সেতুবন্ধন ছিল এই ডাকপিয়ন।
গ্রামের সেই আটপৌরে জীবনে যৌথ পরিবারের কড়া অনুশাসনের মাঝে নতুন বউয়ের পক্ষে মনের কথা প্রকাশ করা সহজ ছিল না। লণ্ঠন জ্বালিয়ে, বাতাসে নিভে যাওয়ার ভয়ে বুক কাঁপিয়ে রাতে লেখা হতো সেই চিঠি। “যেন শাশুড়ি না দেখে, যেন ননদি না দেখে…” সেই সতর্কতায় লুকিয়ে থাকত দাম্পত্যের আদিমতম প্রেম ও লুক্কায়িত আকুতি। দুই টাকার চাকরির টানে বা পেটের দায়ে শহরমুখী স্বামীর জন্য গাঁয়ের সাধারণ সেই বধূটি হয়তো লিখে পাঠাতো—”আমি গাঁয়ের মেয়ে অনেক সুখী, একটু নুন আর ভাতে।” এই সরলতার মাঝে লুকিয়ে থাকা অভিমান ও আত্মত্যাগের ওজন আজকের ডিজিটাল যুগের ভিডিও কলের চেয়ে অনেক বেশি ভারী ছিল।
প্রতি রাতে শেষ ট্রেনটি যখন গ্রামের স্টেশনে এসে থামত, প্রবাসীর স্ত্রী তখন মনে মনে ভাবত—এই বুঝি সে ফিরে এল বাড়ি। ভোরের সোনালী সূর্য উঠত, কিন্তু অনেক সময় আশার ফুল আর ফুটত না। খামের পর খাম আসত ঠিকই, কিন্তু হাতে লেখা হরফগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল সেলফোনের মুঠোয়। আজ আর লণ্ঠন জ্বেলে রাত জাগতে হয় না, মেসেঞ্জের ‘সিন’ অপশনটি জানিয়ে দেয় বার্তা পৌঁছে গেছে। কিন্তু সেই বার্তার মধ্যে কি আর প্রিয়ার চোখের জলের নোনা স্বাদ পাওয়া যায়? আধুনিকতার এই বুনো হাওয়ায় আমরা যোগাযোগ বাড়িয়েছি ঠিকই, কিন্তু হৃদয়ের দূরত্ব কি কমাতে পেরেছি?
আজকের প্রজন্ম হয়তো জানবে না একটি খামের জন্য কত কিলোমিটার পথ হেঁটে আসতেন ক্লান্ত ডাকপিয়ন। কাগজের স্পর্শহীন ইমেইল বা ইনবক্সের ভিড়ে হারিয়ে গেছে সেই ধৈর্যশীল অপেক্ষা। তবুও মাঝেমধ্যে পুরোনো অ্যালবামের পাতা উল্টাতে গিয়ে যদি কোনো হলুদ হয়ে যাওয়া চিঠি হাতে এসে ঠেকে, আজও বুক চিরে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস। সেই ভাঙ্গা হাতের লেখা চিঠিগুলো আমাদের শেকড়, আমাদের নষ্টালজিয়া। যান্ত্রিকতার এই যুগে আজ বড় প্রয়োজন একটু থেমে পেছনে তাকানোর—যেখানে ভালোবাসা মানে ছিল শুধু স্ক্রিনটাচ নয়, একটা আস্ত জীবনকে খামে পুরে প্রিয়জনের ঠিকানায় পাঠিয়ে দেওয়া।
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com