শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

মণিরামপুরের তরুণ চিত্রশিল্পী মোহনের প্রথম একক প্রদর্শনী যশোরেঃ।

মাসুদ রায়হান   |   শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৩০ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

মণিরামপুরের তরুণ চিত্রশিল্পী মোহনের প্রথম একক প্রদর্শনী যশোরেঃ।

 

শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম ও অবদান ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন তরুণ শিল্পী
সমাজের চোখে তাঁরা সাধারণ মানুষ। কেউ কৃষক, কেউ শ্রমিক, কেউবা হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী পেশার কারিগর। অথচ তাঁদের ঘাম, শ্রম ও মেধার ওপর ভর করেই সচল থাকে সমাজ ও সভ্যতার চাকা। প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামে অসামান্য অবদান রাখলেও এসব মানুষের কথা অনেক সময়ই থেকে যায় আড়ালে। সেই উপেক্ষিত ও পরিশ্রমী মানুষগুলোর জীবনগাথা রং-তুলি আর ক্যানভাসে তুলে ধরে ব্যতিক্রমী এক শিল্পভাবনার পরিচয় দিয়েছেন যশোরের মণিরামপুরের তরুণ চিত্রশিল্পী মুরারি মুরলী মোহন।
তাঁর জীবনের প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী শুরু হয়েছে যশোরে। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরিতে পাঁচ দিনব্যাপী এ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। ‘রিয়েল আর্টিস্ট অব সোসাইটি’ (Real Artist Of Society) শিরোনামের এ প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে শিল্পীর ৪০টি চিত্রকর্ম। প্রতিটি শিল্পকর্মে ফুটে উঠেছে শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম, পরিশ্রম, বেঁচে থাকার লড়াই এবং সমাজ গঠনে তাঁদের নীরব অবদানের গল্প।
মণিরামপুর উপজেলার ৫ নম্বর হরিদাসকাঠি ইউনিয়নের পাঁচবাড়িয়া গ্রামের সন্তান মুরারি মুরলী মোহনের ক্যানভাসে উঠে এসেছে কৃষক, শ্রমিকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবন ও কর্ম। পাশাপাশি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী পেশাজীবীদের জীবনচিত্র। এসব চিত্রকর্মের মধ্য দিয়ে শিল্পী শুধু মানুষের অবয়ব আঁকেননি, তুলে ধরেছেন তাঁদের জীবনের বাস্তবতা, শ্রমের মর্যাদা এবং সমাজে তাঁদের অপরিহার্য ভূমিকা।
প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন ভাস্কর শিল্পী মাহবুব জামাল শামীম ও চিত্রশিল্পী সোহাগ পারভেজ। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন হারুন অর রশীদ, মাহমুদ হাসান বুলু, কৃষি গৌতম, সানোয়ার আলম খান দুলু, বাসুদেব বিশ্বাস ও ইহসান আননূর।
নিজের প্রদর্শনীর ভাবনা ও শিল্পকর্মের পেছনের অনুভূতি তুলে ধরে চিত্রশিল্পী মুরারি মুরলী মোহন বলেন, গ্রামে জন্ম ও বেড়ে ওঠার সুবাদে শৈশব থেকেই শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের জীবন খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। তাঁদের প্রতিদিনের পরিশ্রম, জীবিকার সংগ্রাম এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বেঁচে থাকার চেষ্টা তাঁকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে।
তিনি বলেন, জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে জেনেছেন, পরিশ্রমের ফল একসময় পাওয়া যায়। কিন্তু বাস্তব জীবনে খেটে খাওয়া মানুষকে তাঁদের শ্রমের যথাযথ মূল্য পেতে খুব কমই দেখেছেন। মানুষের ঘাম ও শ্রমে যখন সমাজ এগিয়ে যায়, তখন সেই মানুষগুলোর জীবনই অনেক সময় অবহেলিত থেকে যায়। এই উপলব্ধি থেকেই তাঁদের জীবন ও সংগ্রাম ক্যানভাসে তুলে ধরার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন।
মুরারি আরও বলেন, কৃষক, শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ তাঁদের কাজ বন্ধ করে দিলে খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রই থমকে যাবে। অথচ সমাজে তাঁদের অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। যাঁদের শ্রমে মানুষের জীবন সহজ হয়, যাঁদের অবদানে সভ্যতা এগিয়ে চলে, তাঁদের সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী পেশা নিয়েও নিজের উদ্বেগের কথা জানান এ তরুণ শিল্পী। তাঁর মতে, সময়ের পরিবর্তন ও আধুনিকতার প্রভাবে দেশের অনেক ঐতিহ্যবাহী পেশা আজ বিলুপ্তির পথে। এসব পেশার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করা ঐতিহ্যও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। তাঁদের জীবন ও কর্ম সংরক্ষণ করা মানে শুধু একটি পেশার ইতিহাস ধরে রাখা নয়, বরং দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও শেকড়কে বাঁচিয়ে রাখা।
মুরারি বলেন, হারিয়ে যেতে বসা পেশাজীবী ও কর্মজীবী মানুষদের রং-তুলি ও ক্যানভাসের মাধ্যমে একসঙ্গে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি। তাঁর দৃষ্টিতে, এই শ্রমজীবী মানুষরাই প্রকৃত শিল্পী। কারণ, তাঁরা নিজেদের দক্ষতা, শ্রম ও সৃজনশীলতা দিয়ে প্রতিনিয়ত সমাজ ও মানুষের জীবন গড়ে তুলছেন। তাঁদের শ্রমেই বেঁচে থাকে সমাজ, এগিয়ে যায় দেশ।
মণিরামপুরের প্রত্যন্ত পাঁচবাড়িয়া গ্রামের এক তরুণের প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী তাই কেবল ৪০টি চিত্রকর্মের আয়োজন নয়; এটি সমাজের অবহেলিত অথচ অপরিহার্য মানুষগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এক ব্যতিক্রমী প্রয়াস।
শিল্পীর ক্যানভাসে ফুটে ওঠা প্রতিটি মুখ যেন সমাজের কাছে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে—যাঁদের শ্রম ছাড়া আমাদের দৈনন্দিন জীবন অচল, তাঁদের আমরা কতটুকু সম্মান ও মূল্যায়ন করি?
যশোরে আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীরা শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম, কর্ম ও অবদানের পাশাপাশি সমাজের নানা বাস্তবতাকে শিল্পীর চোখে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। আর মণিরামপুরের এই তরুণ শিল্পীর শিল্পকর্ম মনে করিয়ে দিচ্ছে, শিল্পের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু রং ও রেখার নিপুণতায় নয়, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, শ্রদ্ধা এবং তাঁদের না-বলা কথাগুলো তুলে ধরার মধ্যেও নিহিত।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us

ফলো করুন bangladoinik.com-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
ফখরুল ইসলাম
সহসম্পাদক
মো: মাজহারুল ইসলাম
Address

জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com