শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

রাজমিস্ত্রির হাতেই গড়ে ওঠে সাহিত্যের জগৎ, সংগ্রামের নাম জমির হোসেন পারভেজ

শফিকুল ইসলাম বাদল   |   সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ১৩৩ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

রাজমিস্ত্রির হাতেই গড়ে ওঠে সাহিত্যের জগৎ, সংগ্রামের নাম জমির হোসেন পারভেজ

‘বাঁচার তরে লড়ি রে ভাই, বাঁচার তরে লড়ি, পৃথিবী নামের রণাঙ্গনে আমি এক রাজমিস্ত্রি।’—কবিতার এই পঙ্‌ক্তিগুলো যেন রাজমিস্ত্রি জমির হোসেন পারভেজের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। জীবিকার তাগিদে ইট, বালু আর সিমেন্ট দিয়ে অন্যের স্বপ্নের বাড়ি নির্মাণ করেন তিনি। অন্যদিকে, মনের গভীরে লালন করেন সাহিত্যচর্চার স্বপ্ন। দারিদ্র্য, অভাব আর প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করেই চালিয়ে যাচ্ছেন লেখালেখি। পেশায় রাজমিস্ত্রি হলেও সাহিত্যই তাঁর ভালোবাসা, তাঁর বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার বিদ্যাকুট ইউনিয়নের সেমন্তঘর গ্রামের প্রয়াত আব্দুর রহমানের ছেলে জমির হোসেন পারভেজ। ছোটবেলা থেকেই দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছেন তিনি। তাঁর বাবা ছিলেন রাজমিস্ত্রি, আর মা মানসিক প্রতিবন্ধী। পাঁচ ভাইয়ের পরিবারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। ছয় শতক বাড়িতে পাঁচ ভাইয়ের বসবাস। একমাত্র বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। বর্তমানে স্ত্রী, তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে জমিরের সংসার। সন্তানরা সবাই পড়াশোনা করছে। সংসারের খরচ জোগাতে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হলেও সাহিত্যচর্চা থেকে কখনো পিছপা হননি তিনি।
ধার করা টাকায় প্রথম বই প্রকাশ
জমিরের সাহিত্যচর্চার শুরু পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময়। সহপাঠী নার্গিসের অনুরোধে প্রথম কবিতা লেখেন তিনি। কবিতাটির প্রথম কয়েকটি লাইন ছিল—‘আয় সাথিরা দলে দলে, ছুটে যাই স্কুলে। পড়ালেখা করলে পরে, সারা জীবন ধন্যে চলে।’
সেই ছোট্ট প্রয়াস থেকেই লেখালেখির প্রতি ভালোবাসা জন্ম নেয় তাঁর। সময়ের সঙ্গে কবিতা লেখার পাশাপাশি গল্প ও উপন্যাস রচনায়ও মনোনিবেশ করেন। কিন্তু লেখালেখির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় অর্থসংকট।
২০০৫ সালে ধার করা টাকা দিয়ে প্রকাশ করেন নিজের প্রথম উপন্যাস ‘প্রিয়ার মুখটি চোখে ভাসে’। এরপর দ্বিতীয় বই ‘হতাশার প্ল্যাটফরম’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের জন্য বিক্রি করেন বিয়েতে শ্বশুরবাড়ি থেকে পাওয়া আংটি। শুধু তা-ই নয়, বই প্রকাশের খরচ জোগাতে স্ত্রীর মাটির ব্যাংকে জমানো টাকাও কাজে লাগান।


অভাবের সংসারে যেখানে প্রতিটি টাকা হিসাব করে খরচ করতে হয়, সেখানে বই প্রকাশের জন্য এমন ত্যাগ তাঁর সাহিত্যপ্রেমের গভীরতাকেই তুলে ধরে।
জমির বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই কষ্ট করে আসছি। অর্থের অভাবে পড়ালেখা বন্ধ হওয়ার প্রায় ১০ বছর পর বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাস করেছি।’
১০টি বই প্রকাশিত, মঞ্চস্থ হয়েছে ৩৫টি নাটক
প্রতিকূলতার মধ্যেও থেমে থাকেননি জমির। নিজের শ্রম আর অধ্যবসায়ে গড়ে তুলেছেন লেখকসত্তা। এ পর্যন্ত তাঁর গল্প ও উপন্যাসসহ ১০টি বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে আরও চারটি বই। এ ছাড়া তাঁর লেখা পাণ্ডুলিপি থেকে এ পর্যন্ত ৩৫টি নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘প্রিয়ার মুখটি চোখে ভাসে’, ‘হতাশার প্ল্যাটফরম’, ‘প্রসূতির কান্না’, ‘বজ্রকণ্ঠের হুংকার’, ‘চৈত্রের আকাশ আগুনে পুড়ে’, ‘সেই একটি হৃদয়ের প্রত্যাশা’ এবং ‘বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ’৭১-এর রক্তক্ষরণ’সহ আরও কয়েকটি বই।
লেখালেখির পাশাপাশি সম্পাদনার কাজও করেছেন তিনি। তাঁর সম্পাদিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘রাসেল একটি গল্পের নাম নয়’, ‘একটি স্বপ্নের অপমৃত্যু’, ‘ছোটদের মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘বঙ্গবন্ধুর রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ’।
দিনভর রাজমিস্ত্রির কাজ করে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করেন জমির। কাজ শেষে অবসর সময়ে ডুবে যান বই আর লেখালেখির জগতে। জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, মানুষের সুখ-দুঃখ, সমাজের নানা অসংগতি এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তাঁর লেখায় উঠে আসে।
পাঠাগার ঘিরে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড
জমিরের সাহিত্যচর্চা শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর অনুপ্রেরণায় সেমন্তঘর গ্রামে গড়ে উঠেছে ‘সেমন্তঘর মানবকল্যাণ যুব সংগঠন ও গণ মেধাবিকাশ পাঠ্য গ্রন্থাগার’। এই পাঠাগারকে কেন্দ্র করে বই পড়ার পাশাপাশি নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়।
রাজমিস্ত্রির কাজ শেষে নিয়মিত পাঠাগারে গিয়ে বই পড়েন জমির। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে বই পড়ায় আগ্রহী করে তোলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রাখার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছেন তিনি।
পাঠাগারের সভাপতি মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘মূলত জমিরের অনুপ্রেরণায়ই পাঠাগারটি করা হয়েছে। এ পাঠাগারে এখন নিয়মিত এলাকার ছেলেরা আসে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড করা হয়। জমিরের পাণ্ডুলিপি দিয়ে বেশ কয়েকটি নাটক এ পাঠাগারের উদ্যোগে মঞ্চস্থ হয়েছে।’
মানুষের ভালোবাসায় নির্বাচিত অভিভাবক সদস্য
সাহিত্যচর্চা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কারণে এলাকায় রয়েছে জমিরের পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা। স্থানীয় মানুষের ভালোবাসায় একবার বিদ্যাকুট অমর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির অভিভাবক সদস্য পদে প্রার্থী হন তিনি। নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে নির্বাচিতও হয়েছিলেন।
প্রতিবেশী সাইদুর রহমান সাব্বির বলেন, ‘জমিরের অনন্য প্রতিভা রয়েছে। একজন রাজমিস্ত্রি হয়েও তিনি যেভাবে সাহিত্যচর্চা করছেন, তা প্রশংসার যোগ্য।’
স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতার প্রত্যাশা
সংসারের অভাব-অনটন, জীবিকার কঠোর পরিশ্রম আর নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন জমির হোসেন পারভেজ। তাঁর লেখার পাঠক রয়েছেন এলাকায়। স্থানীয় মানুষের ভালোবাসা ও সম্মানই তাঁকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগায়।
জমির বলেন, ‘আমার বইগুলো অনেকে আগ্রহ নিয়ে পড়েন। এলাকার মানুষ আমাকে সম্মান দেন। এটা ভালো লাগে। নামিদামি কোনো প্রকাশনা সংস্থা আমার বই প্রকাশ করলে কৃতজ্ঞ থাকব।’
জীবনের প্রতিটি বাঁকে সংগ্রাম করেও স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছেন জমির হোসেন পারভেজ। দিনের বেলায় ইট-সিমেন্টের গাঁথুনিতে অন্যের স্বপ্নের ঠিকানা তৈরি করেন, আর অবসরে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে নির্মাণ করেন নিজের সাহিত্যভুবন। তাঁর জীবন যেন সেই কবিতারই বাস্তব রূপ—‘বাঁচার তরে লড়ি রে ভাই, বাঁচার তরে লড়ি।’

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us

ফলো করুন bangladoinik.com-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
ফখরুল ইসলাম
সহসম্পাদক
মো: মাজহারুল ইসলাম
Address

জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com