আসাদুজ্জামান তালুকদার : | শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট | ১০২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
বাংলাদেশের মোবাইল টেলিযোগাযোগ খাতে আরেকটি বড় পরিবর্তনের আভাস মিলছে। বিভিন্ন শিল্পসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন ও টেলিযোগাযোগ খাতের আলোচনায় উঠে এসেছে, ২০২৮ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে দেশে ধাপে ধাপে 2G নেটওয়ার্ক বন্ধের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক নীতিগত ঘোষণা আসেনি, তবু বিষয়টি বাস্তবায়িত হলে সেটি হবে দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর।
প্রশ্ন হচ্ছে—বাংলাদেশ কি সেই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত?
2G-এর যুগ শেষ হওয়া কি সময়ের দাবি?
বিশ্বজুড়েই পুরোনো 2G ও 3G প্রযুক্তি ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে। মুক্ত হওয়া স্পেকট্রাম ব্যবহার করা হচ্ছে 4G, 5G এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তিতে। এতে একই ফ্রিকোয়েন্সিতে বেশি গতির ইন্টারনেট, উন্নত ভয়েস সেবা এবং অধিকসংখ্যক গ্রাহককে সেবা দেওয়া সম্ভব হয়।
বাংলাদেশেও বর্তমানে অধিকাংশ স্মার্টফোন ব্যবহারকারী 4G নেটওয়ার্কে যুক্ত। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ এলাকায় 4G কভারেজ পৌঁছেছে। আগামী কয়েক বছরে এই কভারেজ আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কিন্তু কভারেজ আর সেবার মান এক বিষয় নয়।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভয়েস কল
2G প্রযুক্তি মূলত ভয়েস কলের জন্য তৈরি হয়েছিল। দুর্বল সিগন্যালেও অনেক সময় পরিষ্কারভাবে কথা বলা সম্ভব হয়। অন্যদিকে 4G মূলত ডেটাভিত্তিক প্রযুক্তি। এখানে VoLTE-এর মাধ্যমে ভয়েসও ডেটা প্যাকেট হিসেবে আদান-প্রদান হয়।
ফলে নেটওয়ার্ক দুর্বল হলে কল কেটে যাওয়া, শব্দ আটকে যাওয়া কিংবা ভয়েসের মান কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে, যেখানে একটি টাওয়ারের ওপর বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ নির্ভর করেন, সেখানে এই চ্যালেঞ্জ আরও প্রকট হতে পারে।
Low Band 4G ছাড়া সফল রূপান্তর কঠিন
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, 2G বন্ধের আগে 700MHz, 850MHz এবং 900MHz-এর মতো Low Band স্পেকট্রামে 4G সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
এই ব্যান্ডগুলো দীর্ঘ দূরত্ব পর্যন্ত সিগন্যাল পৌঁছাতে পারে এবং ভবনের ভেতরেও তুলনামূলক ভালো কভারেজ দেয়। ফলে গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন VoLTE সেবা নিশ্চিত করতে এগুলোর বিকল্প নেই।
শুধু স্পেকট্রাম বরাদ্দই নয়, পর্যাপ্ত ব্যান্ডউইথ এবং নেটওয়ার্ক অপ্টিমাইজেশনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাটন ফোন ব্যবহারকারীদের কী হবে?
বাংলাদেশে এখনও কয়েক কোটি মানুষ ফিচার বা বাটন ফোন ব্যবহার করেন। তাদের বড় অংশই প্রবীণ, নিম্নআয়ের মানুষ কিংবা গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা।
2G বন্ধ হয়ে গেলে এই ব্যবহারকারীদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের VoLTE সমর্থিত 4G ফিচার ফোন বাজারে সহজলভ্য করতে হবে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এক হাজার টাকার আশপাশে নির্ভরযোগ্য 4G VoLTE ফোন বাজারে না এলে ডিজিটাল বৈষম্য আরও বাড়তে পারে।
এছাড়া নিশ্চিত করতে হবে, নিম্নমূল্যের ফোনেও দুর্বল নেটওয়ার্কে যেন মানসম্মত কল করা যায়।
শুধু প্রযুক্তি নয়, দরকার পরিকল্পিত রূপান্তর
বিশ্বের অনেক দেশ 2G বন্ধ করার আগে দীর্ঘ সময় ধরে গ্রাহকদের নতুন প্রযুক্তিতে স্থানান্তরের সুযোগ দিয়েছে। একই সঙ্গে নেটওয়ার্ক উন্নয়ন, ডিভাইস সহজলভ্য করা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।
বাংলাদেশেও একই ধরনের প্রস্তুতি জরুরি। কারণ টেলিযোগাযোগ শুধু ইন্টারনেট ব্যবহারের বিষয় নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগ, জরুরি সেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
শেষ কথা
2G-এর বিদায় প্রযুক্তিগতভাবে একটি স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয় অগ্রগতি। কিন্তু এই পরিবর্তনের সফলতা নির্ভর করবে কত দ্রুত এবং কত দক্ষতার সঙ্গে 4G অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করা যায়, Low Band স্পেকট্রাম কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায় এবং সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নির্ভরযোগ্য VoLTE ডিভাইস পৌঁছে দেওয়া যায়।
প্রযুক্তি বদলানো সহজ, কিন্তু সেই প্রযুক্তিকে সবার জন্য কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য করে তোলাই হবে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাত এখন সেই পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে।
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com