আনোয়ার হোসেন, নিজস্ব প্রতিবেদক : | রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৫ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
“বিদায়ের বেলা ভাঙল মেলা, ভাঙল সুখের হাট, স্মৃতির পাতায় লেখা রইল তোমার আলোর পাঠ। তুমি যে প্রদীপ জ্বেলে গেলে এই গাঁয়ের আঙিনায়, সে আলোর দ্যুতি কোনোদিনও নিভে নাহি যায়।”
হৃদয় নিংড়ানো আবেগ, চোখের জল আর ভালোবাসার এমন হাজারো স্মৃতির মালা গেঁথে বিদায় জানানো হলো এক আলোকবর্তিকাকে। দীর্ঘ ও গৌরবময় কর্মজীবন শেষে অবসরে গেলেন গাইবান্ধা সদর উপজেলার লেংগা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিম রেজা।
আজ রোববার (০১ নভেম্বর ২০২৬) দুপুর ১২টায় লেংগা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির আয়োজনে সদর উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার খাইরুল ইসলামের সভাপতিত্বে বিদ্যালয় চত্বরে এক জাঁকজমকপূর্ণ এবং অশ্রুসিক্ত বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বর্ণিল সাজে সাজানো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ এদিন রূপ নিয়েছিল আবেগ আর ভালোবাসার এক মিলনমেলায়।
লক্ষ্মীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক ও পশ্চিম কুপতলা ফকিরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হোসেন আলীর সঞ্চালনায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন, গাইবান্ধা সদর-২, আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল করিম। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, গাইবান্ধা সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুল হান্নান, ফুলছড়ি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মাসুমুল ইসলাম, গাইবান্ধা সদর উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার জাহাঙ্গীর আলম।
লক্ষ্মীপুর ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ, লেংগা বাজার আইডিয়াল কলেজের অধ্যক্ষ টি.আই.এম মিজানুর রহমান সরকার, লেংগা বাজার বি. এস উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম, লেংগা বাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান বাদল, লেংগা বাজার আদর্শ দাখিল মাদরাসার সুপার খলিলুর রহমান। এ ছাড়াও বক্তব্য রাখেন, লেংগা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিদায়ী প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিম, সাবেক প্রধান শিক্ষক শাহাবুদ্দীন, সহকারী শিক্ষক জিয়াউর রহমান, শিক্ষার্থী আফরিন জান্নাতিসহ অন্যরা।
অনুষ্ঠানে বিদায়ী শিক্ষাগুরুর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাতে সমবেত হয়েছিলেন আবেগ-আপ্লুত শিক্ষার্থী, সহকর্মী শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি, এলাকার সুধীজন ব্যক্তিবর্গ।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই বিদায়ী শিক্ষকের আশীর্বাদ নিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে শিক্ষার্থী আফরিন জান্নাতি আবেগজড়িত কণ্ঠে সে বলে, “স্যার শুধু আমাদের শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন পরম অভিভাবক। ক্লাসে স্যারের সেই স্নেহমাখা ডাক আর কোনোদিন শুনব না, ভাবতেই বুকটা ফেটে যাচ্ছে। স্যার, আমাদের ক্ষমা করে দেবেন।”
এই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জিয়াউর রহমান, তাঁর বক্তব্যে বলেন, “আমরা একজন সুযোগ্য অভিভাবক ও পথপ্রদর্শককে হারালাম। কর্মক্ষেত্রে তাঁর সততা, নিয়মানুবর্তিতা এবং হাসিমুখ আমাদের সবসময় অনুপ্রেরণা জোগাত। স্যারের শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়।”
এলাকার প্রবীণ সুধীজন ও লেংগা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক শাহাবুদ্দীন
কবিগুরুর ভাষায় বলেন, “যেতে নাহি দিব, হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়।” তিনি যোগ করেন, “রেজাউল স্যার এই গ্রামের প্রতিটি ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর অবদান এই এলাকার মানুষ আজীবন কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করবে।” একজন অভিভাবক বলেন, “আমাদের সন্তানরা মানুষ হয়েছে স্যারের স্নেহে। তিনি চলে যাচ্ছেন, কিন্তু রেখে যাচ্ছেন এক আদর্শের খনি।”
সকলের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় সিক্ত হয়ে বিদায়ী প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিম রেজা মঞ্চে দাঁড়িয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। অশ্রুভেজা চোখে ভাঙা গলায় তিনি বলেন, “এই বিদ্যালয়, এই চত্বর, আমার ছোট ছোট সোনামণিরা—সবই ছিল আমার পরিবার। দীর্ঘ কর্মজীবনে মনের অজান্তে কাউকে যদি কষ্ট দিয়ে থাকি আমায় ক্ষমা করবেন। প্রাতিষ্ঠানিক বিদায় নিলেও, আমার মনটা সবসময় এই বিদ্যালয়ের মাঠেই পড়ে থাকবে।”
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার খাইরুল ইসলাম
তাঁর বক্তব্যে বলেন, “রেজাউল করিম রেজা সাহেব কেবল একজন প্রধান শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এই বিদ্যালয়ের প্রাণভোমরা। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমে লেংগা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আজ এই অঞ্চলে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত। পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে আমরা তাঁর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।”
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুল হান্নান তাঁর বক্তব্যে বলেন, “এই এলাকায় রেজাউল করিম রেজা ছিলেন সবার শ্রদ্ধার পাত্র। আলোকিত মানুষ তৈরিতে তাঁর যে নীরব বিপ্লব, তা আমাদের জন্যও শিক্ষণীয়। তিনি অবসরে যাচ্ছেন প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব থেকে, কিন্তু একজন আলোকবর্তিকা হিসেবে তিনি আমাদের মাঝে আজীবন থাকবেন।”
প্রধান অতিথি গাইবান্ধা-২, আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল করিম তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত অলংকৃত ভাষায় বলেন, “শিক্ষকতা কোনো চাকরি নয়, এটি একটি ব্রত। রেজাউল করিম রেজা সাহেব সেই ব্রত সফলভাবে উদযাপন করেছেন। বিদায়ের এই ক্ষণে মনের কোণে বেজে ওঠে—‘আলোর ফেরিওয়ালা তুমি, আলোর দিশারী, তোমার কর্মের জয়গান গাইবে এ ধরণী চারি’।”
অনুষ্ঠানের শেষভাগে বিদায়ী প্রধান শিক্ষককে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অভিভাবকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উপহার সামগ্রী ও সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
সবশেষে এক আবেগঘন পরিবেশে অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রিয় শিক্ষককে বিদায় জানান উপস্থিত সকলেই। এ সময় বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল বিদায়ের করুণ সুরে, কিন্তু রেখে যাওয়া আদর্শের আলো জ্বলজ্বল করছিল সবার চোখে-মুখে।
জে এস ফুজিয়ামা ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিষ্ঠান। ভ্রাতৃপ্রতিম নিউজ - newss24.com